নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রবাসের কর্মজীবন ছেড়ে নিজ মাটিতে নতুন স্বপ্ন
প্রবাসের কর্মজীবন ছেড়ে দেশে ফিরে নতুন করে স্বপ্ন বুনছেন নড়াইলের কালিয়া উপজেলার ফুলবদিনা গ্রামের হুমায়ুন কবির। দেশে ফিরে প্রথমে গড়ে তোলেন গরুর ডেইরি ফার্ম। এরপর গরুর গোবরকে বর্জ্য হিসেবে ফেলে না রেখে সম্পদে পরিণত করার উদ্যোগ নেন। শুরু করেন ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার উৎপাদন। প্রায় ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগে গড়ে তোলা তার এ উদ্যোগে এখন তৈরি হয়েছে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। তবে দক্ষ কর্মীর সংকট, বাজারজাতকরণের সমস্যা এবং কৃষকদের মধ্যে কেঁচো সারের ব্যবহার সম্পর্কে পর্যাপ্ত পরিচিতি না থাকায় নিজের উদ্যোগ নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন এই প্রবাসফেরত উদ্যোক্তা।
কেঁচো সার কেন গুরুত্বপূর্ণ
কেঁচোকে অনেক সময় ‘প্রকৃতির লাঙল’ বলা হয়। মাটির ভেতরে কেঁচোর চলাচল মাটিকে ঝুরঝুরে করতে এবং জৈব পদার্থ ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কেঁচোর মাধ্যমে গোবর ও অন্যান্য জৈব উপাদান প্রক্রিয়াজাত করে যে জৈব সার তৈরি করা হয়, সেটিই ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার। এটি জৈব পদার্থসমৃদ্ধ হওয়ায় মাটির গুণাগুণ ও উর্বরতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে মাটিতে জৈব উপাদান ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কৃষি ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।
রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ নিয়ে কৃষিবিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ভার্মি কম্পোস্ট সেই সম্ভাবনাময় জৈব সারগুলোর একটি। সঠিকভাবে উৎপাদন ও ব্যবহার করা হলে এটি কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি পূরণে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর একটি পদ্ধতি।
গোবর থেকেই শুরু উদ্যোগ
এই সম্ভাবনাকেই কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন হুমায়ুন কবির। প্রায় তিন বছর আগে বন্ধুদের পরামর্শে গরুর গোবর দিয়ে কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করেন তিনি। শুরুতে ছোট পরিসরে উৎপাদন করলেও উৎপাদিত সার বিক্রি করে ভালো সাড়া পাওয়ায় ধীরে ধীরে প্রকল্পের পরিসর বাড়াতে থাকেন। গরুর খামার থেকে পাওয়া গোবর এখন তার কাছে আর শুধু বর্জ্য নয়; বরং সেটিই হয়ে উঠেছে নতুন উদ্যোগের অন্যতম কাঁচামাল।
৪৮টি হাউজে ২৪ হাজার কেজি সার উৎপাদনের পরিকল্পনা
বর্তমানে হুমায়ুন কবিরের খামারে রয়েছে ৪৮টি সার উৎপাদনের হাউজ। প্রতিটি হাউজে প্রায় ৫০০ কেজি করে সার উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ২৪ হাজার কেজি সার উৎপাদন ও বাজারজাত করার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন তিনি। উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকদের মধ্যে কেঁচো সারের ব্যবহার ও উপকারিতা সম্পর্কে ধারণা তৈরি করাও তার অন্যতম লক্ষ্য।
যেভাবে তৈরি হয় ভার্মি কম্পোস্ট
ভার্মি কম্পোস্ট তৈরির প্রক্রিয়াটি মূলত জৈব উপাদানকে কেঁচোর মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করার ওপর নির্ভরশীল। গরুর গোবরসহ উপযোগী জৈব উপাদান নির্দিষ্ট পরিবেশে রেখে সেখানে কেঁচো ব্যবহার করা হয়। কেঁচো জৈব উপাদান গ্রহণ ও প্রক্রিয়াজাত করার পর যে মল বা কাস্টিং তৈরি করে, সেটিই পরবর্তীতে জৈব সার হিসেবে সংগ্রহ ও ব্যবহার করা হয়।
উৎপাদনের ক্ষেত্রে উপযুক্ত আর্দ্রতা, তাপমাত্রা, ছায়া এবং পরিচর্যা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশের ভারসাম্য ও কেঁচোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ঠিক রাখা গেলে মানসম্মত সার উৎপাদন করা সম্ভব।
২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
উদ্যোক্তা হুমায়ুন কবির বলেন, প্রবাস থেকে ফিরে নিজের এলাকায় কিছু করার চিন্তা থেকেই প্রথমে ডেইরি ফার্ম শুরু করেন। পরে বন্ধুদের পরামর্শে গরুর গোবর দিয়ে কেঁচো সার উৎপাদন শুরু করেন। শুরুতে ভালো সাড়া পেলেও বর্তমানে দক্ষ লোকের অভাব রয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদিত সার কৃষকদের কাছে পরিচিত করানোও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হুমায়ুন কবির বলেন, হাউজ নির্মাণ, ঘর তৈরি এবং সার উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কেঁচো সংগ্রহসহ পুরো প্রকল্পে তার প্রায় ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। এত বড় বিনিয়োগের পর উৎপাদিত সার যথাযথভাবে বাজারজাত করতে না পারলে লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। কৃষকদের মধ্যে এ সারের ব্যবহার ও চাহিদা বাড়াতে কৃষি বিভাগের পরামর্শ এবং সার বিক্রির ডিলারদের সহযোগিতা প্রয়োজন। কৃষি অফিসের সহযোগিতা পেলে তিনি এ উদ্যোগ আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে পারবেন বলে আশা করছেন।
ব্যবসার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ
তার মতে, কেঁচো সার শুধু একটি ব্যবসায়িক উদ্যোগ নয়; এটি একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব কৃষি, কৃষিজ বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে স্থানীয়ভাবে এ ধরনের উদ্যোগের আরও বিস্তার ঘটতে পারে।
কৃষি বিভাগের সহযোগিতার আশ্বাস
কালিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ভার্মি কম্পোস্ট মাটির উর্বরতা ঠিক রাখতে সহায়তা করে। এটি একটি পরিবেশবান্ধব জৈব সার। এ ধরনের সার উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের আগ্রহী হওয়া ইতিবাচক বিষয়। সরকারি পর্যায় থেকে সহযোগিতার সুযোগ থাকলে অবশ্যই তাদের সহায়তা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সার বিক্রির ডিলারদের মাধ্যমে ভার্মি কম্পোস্টের পরিচিতি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর ফলে কৃষকেরা এ সার সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং ব্যবহারে আগ্রহী হতে পারেন।
কৃষিজ বর্জ্য থেকে বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জৈব সার ব্যবহারের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো মাটিতে জৈব পদার্থ ফিরিয়ে দেওয়া। দীর্ঘদিন একই জমিতে চাষাবাদ করতে গিয়ে মাটির জৈব উপাদান কমে গেলে মাটির গঠন ও পানি ধরে রাখার সক্ষমতায় প্রভাব পড়তে পারে। জৈব সার মাটিতে জৈব পদার্থ যোগ করে সেই ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে। আর গরুর গোবরকে সরাসরি ফেলে না রেখে প্রক্রিয়াজাত করে সার হিসেবে ব্যবহার করলে একদিকে যেমন বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা হয়, অন্যদিকে কৃষির জন্য একটি ব্যবহারযোগ্য উপাদানও তৈরি হয়।
বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে গরুর খামার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গোবর ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে। পরিকল্পিতভাবে গোবর সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করা গেলে খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সুযোগও তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে এ ধরনের উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গোবরকে সম্পদে রূপ দিয়ে নতুন স্বপ্ন
হুমায়ুন কবিরের উদ্যোগ সেই সম্ভাবনারই একটি উদাহরণ। প্রবাসে কর্মজীবন শেষে দেশে ফিরে শুধু নিজের জন্য নয়, স্থানীয় কৃষি ও পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত একটি উদ্যোগ গড়ে তুলেছেন তিনি। প্রায় ২০ লাখ টাকার বিনিয়োগে ৪৮টি হাউজ নিয়ে তার প্রকল্প এখন আরও বড় পরিসরে যাওয়ার অপেক্ষায়।
তবে উৎপাদনের পাশাপাশি বাজার তৈরি করাই এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষকদের মধ্যে কেঁচো সারের কার্যকারিতা ও ব্যবহার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, দক্ষ কর্মী তৈরি, সঠিক বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা পাওয়া গেলে উদ্যোগটি আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রবাসের কর্মজীবন ছেড়ে নিজ মাটিতে ফিরে গোবরকে সম্পদে রূপ দিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখছেন হুমায়ুন কবির। তার ৪৮টি হাউজে তৈরি হওয়া কেঁচো সার শুধু একটি পণ্যের গল্প নয়—এটি কৃষিবর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর, পরিবেশবান্ধব কৃষি এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তা তৈরির সম্ভাবনারও একটি গল্প। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ পেলে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমনটাই প্রত্যাশা এই প্রবাসফেরত উদ্যোক্তার।
তথ্যসূত্র Asia Post
আইন উপদেষ্টাঃ অ্যাডভোকেট জাকিয়া মিম চৌধুরী, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ মামুন হাচান। মফস্বল সম্পাদক: শেখ মাহাবুব আলম। প্রধান উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান। অস্থায়ী অফিস: মুজগুন্নি খালিশপুর খুলনা। যোগাযোগ: 01728-060690, ইমেইল: naragatirsangbad@gmail.com ( গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ম মেনে বস্তু নিষ্ঠ তথ্য ভিত্তিক সংবাদ প্রচার করতে আমরা বদ্ধ পরিকর )।
Copyright © 2026 নড়াগাতীর সংবাদ. All rights reserved.