
তেরখাদা প্রতিনিধি
শৈশব থেকেই স্বভাব ছিল শান্ত, ছিল না খেলাধুলার সুযোগও। কিন্তু সীমাবদ্ধতা তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। নিঃশব্দে নিজের ভেতর গড়ে তুলেছে সৃজনশীল এক জগৎ। কখনো রং-তুলিতে ফুটিয়ে তুলেছে মনের ভাবনা, কখনো কবিতায় প্রকাশ করেছে অনুভূতি, আবার কখনো আবৃত্তি ও ডিজাইনের মাধ্যমে তুলে ধরেছে নিজের প্রতিভা। বলছি আলহাজ্ব সারোয়ার খান কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ঐশীর কথা। চিত্রশিল্পী, ডিজাইনার, কবি ও আবৃত্তিকার—বিভিন্ন পরিচয়ে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছে সে।
২০১০ সালে খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটী গ্রামে জন্ম ঐশীর। ছোটবেলা থেকেই সে ছিল কিছুটা চুপচাপ প্রকৃতির। সহপাঠীদের সঙ্গে মেলামেশার চেয়ে নিজের মতো করে সময় কাটাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। শৈশবে অসুস্থতার কারণে খেলাধুলা থেকেও তাকে দূরে থাকতে হতো। তবে এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তার সৃজনশীলতার জগৎ।
ঐশীর শিক্ষাজীবনের শুরু আসমা সারোয়ার শিশু একাডেমীতে। পরে সে ভর্তি হয় প্রতিভাময়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পড়াশোনায়ও ছিল মেধার পরিচয়। প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়ে তার রোল নম্বর থাকত প্রথম তিনের মধ্যে। শিক্ষকেরা তাকে পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশেরও পরামর্শ দিতেন। তাঁদের উৎসাহই একসময় ঐশীর মনে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস জোগায়।

এরপর থেকেই আড়ালে আড়ালে ছবি আঁকা ও কবিতা লেখার চর্চা শুরু করে ঐশী। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় তার আঁকা ছবি নজর কাড়ে প্রতিভাময়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সোনিয়া ম্যাডামের। তিনি ঐশীকে একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেন। প্রথমবার অংশ নিয়েই উপজেলা পর্যায়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করে সে। এই সাফল্য তার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার অর্জন করতে থাকে ঐশী।
কবিতা আবৃত্তির ক্ষেত্রেও তার পথচলা শুরু হয় শিক্ষকদের উৎসাহে। একই বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ময়না ম্যাডাম প্রথম তাকে আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য নাম দেন। প্রথম প্রতিযোগিতাতেই প্রথম স্থান অর্জন করে ঐশী। এরপর বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার জিতেছে সে। এসব পুরস্কারের মধ্যে প্লেটও ছিল, যা তার কাছে বিশেষ স্মৃতির অংশ হয়ে আছে।
ঐশীর সৃজনশীলতার পেছনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা ছিলেন তার নানা, বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম উকিল। নানার উৎসাহ ও ভালোবাসায় তার কবিতার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। প্রথমদিকে মুখে মুখে কবিতা বলত সে। পরে সেগুলো লিখে রাখত এবং নানাকে পড়ে শোনাত। পরিবারের অন্যরা তার কবিতা লেখার বিষয়টি জানতেন না; নানা ছিলেন তার একান্ত শ্রোতা ও অনুপ্রেরণা।
কবিতা আবৃত্তি কিংবা লেখার স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার পেলে ঐশী আগে নানাকে সেটি ব্যবহার করতে দিত। নানা ব্যবহারের পর সে নিজে ব্যবহার করত। ছোট্ট এই অভ্যাসের মধ্যেই ধরা পড়ে নানার প্রতি তার গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।
কিন্তু একসময় সেই প্রিয় মানুষটিকে হারাতে হয় তাকে। নানার মৃত্যুর পর কবিতা লেখাও বন্ধ হয়ে যায় ঐশীর। যাঁকে নিজের লেখা কবিতা পড়ে শোনাত, তিনি আর পাশে নেই—এই শূন্যতা তাকে দীর্ঘদিন কবিতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
এরপর অনেকটা সময় পেরিয়ে যায়। সপ্তম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জনের পর পুরস্কার হিসেবে পাওয়া একটি প্লেট নিয়ে নানাবাড়িতে যায় ঐশী। সেই মুহূর্তে যেন ভুলে গিয়েছিল, তার নানা এক বছর আগেই মারা গেছেন। স্মৃতির টানে নানার কাছে ফিরে যাওয়ার এই ঘটনাটি তার জীবনের আবেগঘন অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
পরবর্তী সময়ে কবিতা লেখার বদলে ছবি আঁকায় বেশি মনোযোগী হয় ঐশী। বর্তমানে হ্যান্ড পেইন্টিংয়ের কাজের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছে সে। নিজের সৃজনশীলতাকে আরও বিকশিত করার পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতা অর্জনেও আগ্রহী ঐশী। এসএসসি পাস করার পর অবসর সময়ে দিঘলিয়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে ‘কম্পিউটার অপারেশন লেভেল-২’ কোর্স সম্পন্ন করেছে সে।
বর্তমানে ঐশী দিঘলিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আলহাজ্ব সারোয়ার খান কলেজের একাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়ন করছে। পড়াশোনার পাশাপাশি চিত্রকর্ম, হ্যান্ড পেইন্টিং ও ডিজাইনের মাধ্যমে নিজের প্রতিভাকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে সে।
ঐশীর জীবনকাহিনি কেবল কয়েকটি পুরস্কার অর্জনের গল্প নয়; এটি নিঃসঙ্গতা, শৈশবের সীমাবদ্ধতা, প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা এবং সৃজনশীলতার মধ্য দিয়ে নিজের পরিচয় গড়ে তোলার গল্প। নানার দেওয়া অনুপ্রেরণা, শিক্ষকদের উৎসাহ আর নিজের চেষ্টাকে পুঁজি করে এগিয়ে চলেছে ঐশী। তার এই পথচলা ভবিষ্যতে আরও সাফল্য বয়ে আনবে—এমন প্রত্যাশা তার শুভাকাঙ্ক্ষীদের।