
শহীদ নবাব বাহাদুর সিরাজউদ্দৌলার ইতিহাস অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবে বিকৃত করা হয়েছিল। তৎকালীন বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠাকল্পে এবং স্বদেশী ষড়যন্ত্র– কারীদের অবস্থানকে বিপদমুক্ত করার জন্য। শহীদ নবাব বাহাদুর সিরাজউদ্দৌলার সামগ্রিক চরিত্রকে এমনভাবে কলঙ্কিত করা হয়েছে যে বিগত ২৬৭ বছরেও প্রকৃত ইতিহাস নির্মান সম্ভব হয়নি। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় বৃটিশ শাসন শেষে আমরা দু’বার স্বাধীনতা অর্জন করেছি, অথচ সঠিক ইতিহাস নির্মান ও শহীদ নবাবের আসল মূল্যায়নের প্রচেষ্টা এ পর্যন্ত হয়নি বললেই চলে। আমাদের দেশে শতাধিক স্বায়ত্ত -শাসিত ও বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে, বর্তমানে শত শত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ আছে। হাজার হাজার ইতিহাসের অধ্যাপক ও গবেষক নিয়মিত ভাবে কাজ করে চলেছে অথচ কারও এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়ার খবর আমরা আজও জানতে পারিনি। আমার মনে হয় আমরা আমাদের প্রকৃত ইতিহাস উদ্ঘাটন করতে পারলে জাতি গর্বিত হতো। এ জাতি স্বাধীনতার মূল্য বুঝতে পারত এবং শহীদ নবাব সিরাজউদ্দৌলার ইতিহাস বিশ্লেষণ করে অনুপ্রেরণা লাভ করতে পারত।
মাত্র ২৪ বছর বয়সে সিরাজউদ্দৌলা বাংলা,বিহার,উড়িস্যার নবাব বাহাদুর হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। নবাব বাহাদুর আলীবর্দী খাঁর জীবিতাবস্থায় তরুণ সিরাজকে বহু যুদ্ধ বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিতে হয়ছিল। সিরাজের সাহস, রনকৌশল ও বীরত্বে অগাধ বিশ্বাস ছিল ছিল বলেই নবাব আলীবর্দী খাঁ তরুণ সিরাজকে বহুবার কঠিন দায়িত্ব দিতে ভরসা পেয়েছিলেন।
নবাব আলীবর্দী খাঁ বিদেশী ও দেশি ষড়যন্ত্রকারীদের সম্বন্ধে অত্যন্ত সজাগ ছিলেন এবং সিরাজকে ওইসব শত্রুদের ব্যাপারে বার বার অবহিত করে গিয়েছিলেন। এখানে স্মর্তব্য যে, বৃটিশ, ফরাসি, ডাচ ও পর্তুগিজ নাবিকেরা এদেশে ব্যবসার অযুহাতে এসে এখানে দূর্গ নির্মাণ, সৈন্য সংগ্রহ, ষড়যন্ত্র ও অবৈধ ব্যবসা বানিজ্যে লিপ্ত হয়ে এদেশকে শোষণ করার জন্য রাজনৈতিক শক্তি ও দেশ পরিচালনার ক্ষমতা অর্জনের জন্য নানা অপকৌশল ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। ঠিক ওই সময়ে রাজ্যের ওই দুর্দিনের সন্ধিক্ষণে সিরাজউদ্দৌলা
নবাবের মসনদে আরোহন করেই সম্ভাব্য সর্ব দিক থেকেই ষড়যন্ত্র ও শত্রুতার মুখোমুখি হন।প্রথমত সিরিজের খালা ঘষেটি বেগম সিরাজ উদ্দৌলার নবাবিত্ত্ব সহ্য করতে না পেরে নবাবকে উৎখাত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন।
দ্বিতীয়ত, বেশ কয়েকজন অমুসলিম ও মুসলিম উচ্চ পদস্ত সরকারী কর্মকর্তা, সিরাজের মতো সাহসী ও বলিষ্ঠ শাসন কর্তার পরিবর্তে একজন দূর্বল নবাবকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করার মানষে নানা রকম দুরভিসন্ধিরআশ্রয় গ্রহণ করে।
তৃতীয়ত, বৃটিশ ও ফরাসী তথাকথিত নাবিক ও ব্যবসায়ীরা অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক শক্তি হাসিলের জন্য দেশীয় বিশ্বাসঘাতকদের সাথে নানাভাবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
চতুর্থত, আহম্মদ শাহ্ আবদালীর হুমকি তরুণ নবাব সিরাজকে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্থ করে রেখেছিল। নবাব আলীবর্দী খাঁ ৮০ বছর বয়সে ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১০ এপ্রিল পরলোক গমন করেন। তার ৪দিন পর অর্থাৎ ১৫ এপ্রিল মীর্জা মোহাম্মদ সিরাজউদ্দৌলা বাংলা, বিহার ও উড়িস্যার সিংহাসনে আরোহন করেন।
যে জেত হলওয়েল ও দি দি রমেশ চন্দ্র মজুমদারের বিবরন থেকে জানা যায়, নবাব আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে সিরাজকে উপদেশ দেন, ইউরোপের বনিকদের শক্তি ও প্রতিপত্তি সম্পর্কে সর্বদা সতর্ক দৃষ্টি রাখবে। আল্লাহ আমাকে আরও কিছুদিন বেঁচে থাকার সুযোগ দিলে আমি এই ভয় থেকে তোমাকে মুক্ত করে যেতে পারতাম। এখন এই দায়িত্ব তোমার।
সিংহাসনে আরোহনের পর অল্পদিনের মধ্যেই নবাব সিরাজ কঠোর হস্তে ঘরের শত্রু দমন করেন। অতঃপর দেশ প্রেমিক সিরাজ বিদেশী শত্রু দমনের জন্য অস্থির হয়ে উঠেন।এ পর্যায়ে তিনি ফরাসী বনিকদের সাহায্যে ইংরেজ শত্রুদের সমূলে ধ্বংস করার প্রস্তুতি নেন।পর পর কয়েকবার নিজে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। কাশিমবাজার কুঠি,চন্দন নগর কুঠি, এমনকি কলকাতাকে ইংরেজিদের হাত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করেন।
১৭৫৬ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত অর্থাৎ সিরাজ শাসনের এই ১৪ মাস ৭ দিনের দিনপঞ্জি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়,নবাব সিরাজ প্রতিটি দিন শাসনকার্য সুসংগঠন, শত্রু ও ষড়যন্ত্র দমন, ফরাসী বনিকদের সাথে সমঝোতা রক্ষন ও ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ বিগ্রহ ইত্যাদি অতি ব্যস্ত ও চিন্তিত সময় কাটিয়েছেন।
এ ধরনের রাজকীয় ব্যস্ততা ও দুঃশ্চিতার মধ্যে তার ব্যক্তিগত সুখ স্বাচ্ছন্দ্য কিংবা বিলাসিতার সময় আসলো কোত্থেকে? অথচ ব্রিটিশ আমলের ঐতিহাসিকরা সিরিজ এর ব্যক্তিগত চরিত্রকে ঘৃনা ও জঘন্য হিসেবে চিত্রায়িত করতে দ্বিধাবোধ করেনি।
শুধু ব্রিটিশ নয়, হিন্দু ও মুসলমান অল্প শিক্ষিত তথাকথিত ঐতিহাসিকরাও পৌনে ২শ বছর ধরে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে অন্যায়,অত্যাচারী, বিলাসী ও লোভী এমনকি দুশ্চরিত্র দূর্বল নবাব হিসেবে প্রমাণিত করার প্রয়াস পেয়েছে। অথচ কিছু কিছু ফরাসী পর্যটক, বনিক,গভর্নর ও ঐতিহাসিকদের বর্ননায় সিরাজ চরিত্রের প্রকৃত রূপের বর্ণনা আছে। তাদের বর্ননা একত্র করে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সিরাজ রাজনৈতিক চরিত্রে অত্যন্ত সাহসী ও সূক্ষ্ম কুটনীতিবিদ এবং ব্যক্তি চরিত্রে সহজ সরল ও বলিষ্ঠ নবাব ছিলেন।৷
তিনি স্ত্রী বেগম লুৎফুন্নেছাকে প্রান দিয়ে ভালোবাসতেন।আবার শত্রুপক্ষের সাথে মোকাবেলায় অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। তিনি শাসনকার্য পরিচালনায় দক্ষতার বহু স্বাক্ষরও রেখে গিয়েছেন। সিরাজ মাতা আমিনা বেগম ও স্ত্রী লুৎফুন্নেছা বেগম উভয়ই দানশীলতা, ক্ষমতা প্রদর্শন ও দরিদ্র সেবার জন্য সুখ্যাতি অর্জন করেন
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে জীবন বিসর্জন দিতে হয়েছে। ইচ্ছা করলে তরুণ নবাব সিরাজ ব্রিটিশ বনিকদের বানিজ্য সুবিধা কিছুটা বাড়িয়ে এবং তাদের ঔদ্বাত্য সহ্য করে বহু যুগ শান্তিতে নবাবী করে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য তার অকৃত্রিম ভালবাসার নিদের্শন স্বরূপ তিনি সব শত্রুকে চিহ্নিত করে তাদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেশের স্বাধীনতা কে মজবুত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তা পারেননি।
আমাদের ইতিহাস বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস এবং আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করিনা। আমরা আজও আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম শহীদ নবাব বাহাদুর সিরাজউদ্দৌলাকে তার উপযুক্ত মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে পারিনি। আজো আমরা আমাদের সঠিক ইতিহাস জানার চেষ্টা করিনা। তৎকালীন ফরাসী বনিক, পর্যটক ও ঐতিহাসিকদের বর্ননা জোগাড় করিনি। এমনকি তেমন কোন ঐতিহাসিক গবেষণার উদ্যোগ গ্রহণ করিনি। জাতি হিসেবে আমাদের জাতিয় ইতিহাস উদ্ধারের এই ব্যর্থতা আমাদের পরনির্ভর করে তুলেছে।
অসহায় জাতির আত্মা এজন্য ছটফট করে অহরহ।অথচ আমরা যারা তথাকথিত শিক্ষিত , জাতির এ নৈতিক চাহিদা পূরনে তাদের যেন কোন চিন্তা নেই, বিকার নেই, অবসর নেই। আমরা যেন ভুলেই গেছি যে, নবাব সিরাজ উদ্দৌলার প্রানপ্রিয় স্ত্রী বেগম লুৎফুন্নেছা পরিবারের অন্যান্যদের সাথে প্রায় ৫ বছর কাল
ঢাকায় বুড়িগঙ্গার অপর তীরে, জিঞ্জিরায় বসবাস করেছেন। সে বাড়িটি এখনও বিদ্যমান। ১৭৬২ সালে ইংরেজদের হাতে ধরা পড়লে তাকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত করা হয়। তাকে সেখানে একটা বাড়ি এবং মাসিক মাসোহারা দেয়া হয়।(তখন বাংলার রাজধানী ছিল মুর্শিদাবাদ)।
বেগম লুৎফুন্নেছা খোশবাগে সিরাজের কবরের কাছে একখানি কুঁড়েঘর তৈরি করে বাকি জীবনটা সেখানেই কাটিয়েদেন। কতবড় বিদুষী ও মহিয়ষী নারী হলে জীবনের সব লোভ আয়েশ ছেড়ে তিনি জীবনের বেশিরভাগ সময়টি প্রানধিক প্রিয় স্বামী সিরাজের ধ্যান করেই কাটিয়ে দেন।
তিনি প্রতিদিন নিয়মিত কবরের পাশে বসে কোরআন শরীফ পড়তেন এবং মাসিক যে মাসোহারা পেতেন তা দিয়ে প্রতিদিন কাঙালি ভোজের ব্যবস্থা করতেন। বেগম লুৎফুন্নেছা সুদীর্ঘ ২৮ বছর ধরে এভাবে স্বামীর সেবা করে ১৭৯০ সালের নভেম্বর মাসে পরলোক গমন করেন। এবং সিরাজের পদতলে সমাধিস্থ হন। বেগম লুৎফুন্নেছার এই একনিষ্ঠ প্রেম, ভালোবাসা ও ত্যাগ বাংলার ইতিহাসে সর্বকালে সমুজ্জ্বল হয়ে থাকবে। আর এ ইতিহাস কি সিরাজউদ্দৌলার চরিত্রের পবিত্র গুণাবলীর স্বাক্ষর হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হবেনা??
লেখক এম এ মান্নান