
কামরুন তানিয়া, উখিয়া (কক্সবাজার)
নারীপ্রধান পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা যাচাই করে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগী নির্বাচন করতে কক্সবাজারের উখিয়ায় তথ্য সংগ্রহবিষয়ক অবহিতকরণ সভা ও প্রেস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশব্যাপী এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উদ্যোগে এ আয়োজন করা হয়।
সোমবার (১২ অক্টোবর) বেলা ২টায় উখিয়া উপজেলা প্রশাসনের হলরুমে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রোজিনা আক্তার রুমির সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার জেলা প্রেসক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এম আর আয়াজ রবি, জেলা প্রেসক্লাবের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক কামরুন তানিয়া, উখিয়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহমেদ, সমাজসেবা কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমের সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী কর্মীরা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার বলেন, ফ্যামিলি কার্ড সরকার অগ্রাধিকারভিত্তিতে বাস্তবায়ন করছে। উখিয়া একটি জনবহুল ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন উপজেলা। এখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। এ কারণে কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহ ও উপকারভোগী নির্বাচনে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রমে কোনো ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা ও স্বজনপ্রীতি বরদাশত করা হবে না। কোনোভাবেই যেন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কেউ এ কর্মসূচির উপকারভোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না হন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় কোনো পরিবার যেন ভুল তথ্য বা কারও মিথ্যা প্ররোচনার কারণে অযথা সন্দেহের মুখে না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে হবে। তথ্য সংগ্রহের সময় প্রতিবেশীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যসহ সংশ্লিষ্ট সব তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করার নির্দেশনাও দেন তিনি।
ইউএনও আরও বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন, অধিকার, মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। এ লক্ষ্যেই পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড প্রদানের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কর্মসূচির উদ্দেশ্য, নীতিমালা ও বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে অবহিত করতে গণমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
সভায় ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পাইলটিং কার্যক্রম, উপকারভোগী নির্বাচন, বাজেট বরাদ্দ এবং দেশব্যাপী তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। সভায় জানানো হয়, গত ১০ মার্চ ২০২৬ তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পাইলটিং কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন। পাইলটিং পর্যায়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দেশের আট বিভাগের ৪৪টি জেলার ৫৫টি উপজেলা এবং সিটি করপোরেশনের ৫৭টি ইউনিটে মোট ১ লাখ ১২ হাজার ৯৪টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রক্সি মিনস টেস্ট (পিএমটি) স্কোরের ভিত্তিতে নির্বাচিত ৭১ হাজার ৮৩১ জন যোগ্য উপকারভোগীকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা দেওয়া হয়েছে বলে সভায় জানানো হয়।
সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, পাইলটিং কার্যক্রমে বরাদ্দ করা ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে ৬৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৫৭ কোটি ২০ লাখ টাকা ভাতা হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার মধ্যে ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভাতা খাতে নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
কর্মসূচির আওতায় পরিবারগুলোর আর্থসামাজিক অবস্থা যাচাইয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হালনাগাদ প্রক্সি মিনস টেস্ট (পিএমটি) পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। এ পদ্ধতিতে পরিবারগুলোকে আর্থসামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হবে—অতিদরিদ্র, দরিদ্র, ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত। সভায় জানানো হয়, পিএমটি স্কোর অনুযায়ী ৮৬০ বা তার কম নম্বর পাওয়া নারী পরিবারপ্রধান ভাতা পাওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। তবে কার্ড প্রদান ও ভাতা পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কর্মসূচির নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করা হবে।
সভায় আরও জানানো হয়, ১২ অক্টোবর ২০২৬ থেকে দেশব্যাপী একযোগে পরিবারভিত্তিক তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড খানা তথ্য সংগ্রহ নির্দেশিকা, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের কাজে ৬৬ হাজার ৮১৫ জন তথ্য সংগ্রহকারী এবং ৩৬ হাজার ৬৮১ জন সুপারভাইজার নিয়োগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণের প্রথম পর্যায়ও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানানো হয়।
তথ্য সংগ্রহকারীরা বিশেষায়িত ট্যাবলেট ডিভাইস ব্যবহার করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করবেন। সংগৃহীত তথ্য সরাসরি অনলাইন ডেটাবেইসে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি, মোবাইল সিম সংগ্রহ, নেটওয়ার্কভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা, কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার (এনওসি) স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে বলে জানান উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রোজিনা আক্তার রুমি।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও স্বচ্ছ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত যোগ্য পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। এতে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির সুফল যথাযথ উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছানোর পাশাপাশি নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার হবে।