
নড়াইল প্রতিনিধি
নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নড়াগাতী থানার টোনা গ্রামে জন্মগ্রহণ করা কৃতি সন্তান আব্দুল হাকিম ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক, সাহিত্যিক ও সমাজসেবক— যাঁর অবদান এখনো শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন;
আব্দুল হাকিম ১৯০১ সালের ১৭ আগস্ট তৎকালীন যশোর জেলার টোনা গ্রামে এক বাঙালি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন মৌলভী নাজিমউদ্দিন মোল্লা এবং মাতা মোসম্মাৎ রাব্বানী বেগম। গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি কালিয়া হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি বিষয়ে বিএ ও এমএ এবং এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।
আইন ও রাজনীতির পথে:
কলকাতায় আইনচর্চা শুরু করার সময় তাঁর পরিচয় ঘটে তৎকালীন রাজনীতিবিদ এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, সুভাষচন্দ্র বসু ও আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে। ধীরে ধীরে তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৯৩৭ সালে খুলনা জেলা থেকে নির্বাচিত হয়ে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলিতে প্রবেশ করেন।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং খুলনা বারে আইনজীবী হিসেবে যুক্ত হন। এ সময় তিনি ১৯৪০ সালে খুলনা পল্লীমঙ্গল হাই স্কুল ও পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে খুলনা সিটি ল’ কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে তিনি প্রথম অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।
স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব ও বিতর্কিত সময়:
১৯৫৪ সালে ইউনাইটেড ফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হয়ে স্পিকার পদে আসীন হন। তবে ১৯৫৮ সালে এক আওয়ামী লীগ সদস্যের পিটিশনের প্রেক্ষিতে তাঁকে ‘অসুস্থ মানসিক অবস্থা’ ঘোষণা করা হয়। একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এক সংসদীয় অধিবেশনে বিশৃঙ্খলার মধ্যে কাগজপত্রের ওজনদার বস্তু নিক্ষেপে পরিষদের চেয়ারম্যান শহীদ আলী পাটোয়ারী আহত হয়ে মারা যান— যা সে সময় ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংবাদিকতা:
শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান অনন্য। খুলনায় আইনি শিক্ষা ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার প্রসারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি কবিতা রচনা ও অনুবাদে পারদর্শী ছিলেন এবং কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার ইংরেজি সংকলন The Fiery Lyre of Nazrul Islam প্রকাশ করেন। পাশাপাশি দ্য পাকিস্তান অবজারভার, হলিডে ও দ্য ওয়েভ সহ বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার:
১৯৬৮ সালের ১৩ জানুয়ারি তিনি খুলনায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর খুলনা সিটি ল’ কলেজ ও পল্লীমঙ্গল হাই স্কুল তাঁর নাম ও অবদানের স্মৃতিকে ধারণ করে আছে। খুলনা বার অ্যাসোসিয়েশনসহ নানা সংগঠন তাঁকে প্রতি বছর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। নড়াগাতীর এই কৃতি সন্তান শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা নন, ছিলেন এক আলোকবর্তিকা— যিনি শিক্ষা, সমাজসেবা ও রাজনীতিতে অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
সংগ্রহে: মো. মনিরুজ্জামান চৌধুরী, মূলশ্রী, নড়াগাতী, কালিয়া, নড়াইল। ০৩ আগস্ট ২০২৫।