
নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা | ২৪ জুলাই ২০২৫
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর খুলনার ফুলতলা শাখার স্টোর কক্ষে এক গ্রাহককে চোখ ও মুখ বেঁধে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো এবং প্লাস দিয়ে নখ তোলার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি সাইফুল্লাহ হাজেরী (৩৫) বর্তমানে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ভুক্তভোগী সাইফুল্লাহ ফুলতলা উপজেলার বেলেপুকুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ইসলামী ব্যাংকের একটি এজেন্ট ব্যাংক “হাজেরী এন্টারপ্রাইজ”-এর স্বত্বাধিকারীর ছেলে। অভিযোগ রয়েছে, এজেন্ট ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা প্রায় ৪০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যাওয়ার পর ব্যাংকের তদন্ত ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের নামে সাইফুল্লাহকে বর্বর শারীরিক নির্যাতন করা হয়।
বুধবার দুপুরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পঞ্চম তলার পেইন ওয়ার্ডে দেখা যায়, রক্তমাখা সাদা পায়জামা ও গেঞ্জি পরে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন সাইফুল্লাহ। দুই পায়ে হাতুড়ি দিয়ে পেটানোর দাগ কালচে ও নীল হয়ে গেছে, যা কম্বল দিয়ে আড়াল করছেন স্বজনরা। হাতে নখ তোলার চেষ্টায় জমাট রক্ত, আঙুল ফুলে গেছে। পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছেন তার দুই বোন, মামা ও পিতা—শোকে নির্বাক তারা।
পরিবার জানায়, ঘটনার পরপরই ইসলামী ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা হাসপাতালে এসে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন এবং যাতে কোনো মামলা না হয় সেজন্য চাপ দিচ্ছেন।
সাইফুল্লাহ বলেন, মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) বিকেল চারটায় ব্যাংকের এক কর্মকর্তার ডাকে তিনি ফুলতলা শাখায় যান। সঙ্গে তার পিতাও ছিলেন। সেখানে ব্যাংকের কর্মকর্তারা তাকে ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত করার চেষ্টা করেন এবং ব্ল্যাংক চেক ও সাদা কাগজে স্বাক্ষর চান। তিনি কিছুটা সময় চেয়ে তার বাবাকে বাড়ি পাঠান চেকবই আনতে।
এই সুযোগে ব্যাংকের এক প্রিন্সিপাল অফিসার আশিক তাকে জোরপূর্বক স্টোর রুমে নিয়ে যান। সেখানে আরও চার-পাঁচ জন মিলে চোখ-মুখ বেঁধে তাকে নির্মমভাবে পেটায়। পায়ের তালু ও হাঁটুতে হাতুড়ির আঘাত এবং আঙুলে প্লাস দিয়ে নখ উঠানোর চেষ্টা চালানো হয়। পরে তার কাছ থেকে ব্ল্যাংক চেক, স্ট্যাম্প ও সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
সাইফুল্লাহ বলেন, “আমরা পালিয়ে যাইনি, বরং ক্ষতিপূরণ দিতে উদ্যোগ নিয়েছি। কিন্তু আমাকে যে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে, তা সভ্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না।”
ভুক্তভোগীর বাবা এ এইচ এম শফুল্লাহ হাজেরী বলেন, “আমরা জমি বিক্রি করে গ্রাহকের টাকা ফেরতের প্রক্রিয়ায় আছি। ইতোমধ্যে ব্যাংকের কথায় চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষরও করেছি। এরপরও আমার ছেলেকে চোখ বেঁধে পিটিয়ে নখ তোলার চেষ্টা করা হয়েছে—এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” পরিবার জানিয়েছে, সাইফুল্লাহর চিকিৎসা শেষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইসলামী ব্যাংক ফুলতলা শাখার ব্যবস্থাপক আনিসুর রহমান বলেন, “ঘটনার সময় আমি অফিসে ছিলাম না। কী ঘটেছে সঠিকভাবে জানি না। তবে তদন্ত চলছে, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ইসলামী ব্যাংক খুলনা জোনের জেনারেল ম্যানেজার ইমামুল বারী জানান, “বিষয়টি আমরা মঙ্গলবার রাতে জানতে পারি। আমাদের প্রতিনিধি টিম হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ঘটনা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।”
এ ঘটনায় স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, কোনো অভিযোগের তদন্ত চলাকালীন ব্যাংক ভেতরে একজন গ্রাহককে চোখ বেঁধে মারধর ও জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল। অবিলম্বে দায়ীদের গ্রেফতার ও স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে তারা।