
উম্মে উমামা রাত্রি
খুলনা শহরের শিববাড়ী মোড়ে প্রতি রোববার দুপুরে তৈরি হয় এক ভিন্ন দৃশ্য। টেবিলে সাজানো ভাত, ডাল, সবজি আর ডিম—ঝকঝকে বোল যেন কোনো দামি রেস্তোরাঁর পরিবেশ। তরুণ-তরুণী সেচ্ছাসেবীরা ব্যস্ত খাবার পরিবেশনে। অতিথিরা অবশ্য ভিন্ন—রিকশাচালক, দিনমজুর, পথশিশু কিংবা অসহায় নারী। কেউ বসেন রিকশার সিটে, কেউ ফুটপাতে পাতা মাদুরে। ক্ষুধার্ত মুখে আসেন, সন্তুষ্টির হাসি নিয়ে ফেরেন।
এই আয়োজনের নাম ‘গরিবের ফ্রি বুফে’। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ফুডব্যাংকিং খুলনা কল্যাণ সংস্থা গত ১০ আগস্ট থেকে শুরু করেছে এ উদ্যোগ। ২০১৭ সাল থেকে সংগঠনটি খুলনা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ ও খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। এর অংশ হিসেবে এখন থেকে প্রতি রোববার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য শিববাড়ীতে বিনামূল্যে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে।
সংগঠনের প্রধান স্বেচ্ছাসেবক এ এইচ এম শাহারিয়ার মাসুদ মেঘ বলেন, “আমরা চাই মানুষ শুধু খাবারই না, খাবার খাওয়ার সময় সম্মানও পাক। ধনী-গরিবের ভেদাভেদ যেন টেবিলে না থাকে। তাই রেস্তোরাঁর মতো পরিবেশে খাবার সাজাই, সেচ্ছাসেবকরা পরিবেশন করে। এতে ওদের মনে হয়, আমাদেরও মর্যাদা আছে।”
১৫ জন সেচ্ছাসেবী এ কর্মসূচিতে কাজ করছেন। তাদের মধ্যে মাহিন শাহারিয়ার, মো. রাসেল, জুবায়ের সাদিক, আইরী ইসলাম ইরানি ও জেরিন তাসনিম রোজা উল্লেখযোগ্য। সেচ্ছাসেবক জেরিন তাসনিম রোজা বলেন, “এ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সহযোগিতা দরকার। আমাদের স্বপ্ন, একদিন শুধু সপ্তাহে একবার নয়, একাধিক দিন এই আয়োজন হবে। গরিব, অসহায় মানুষের মুখের হাসিতেই আমাদের তৃপ্তি।”
রিকশাচালক মো. হান্নান মোল্লা জানালেন, “সারাদিন রিকশা চালাই। অনেক সময় ঠিকমতো খাওয়া হয় না। এখানে এসে খেতে পেরে মনে হয়, আমি মানুষ হিসেবে সম্মান পাচ্ছি। শুধু পেটই ভরছে না, মনটাও ভরে যাচ্ছে।”
রিকশাচালক, দিনমজুর, পথশিশু থেকে শুরু করে অসহায় নারীরা এ বুফেতে আসেন। অনেকের মতে, অল্প আয়ের কারণে দিনে দুইবেলা খাওয়া সবসময় সম্ভব হয় না, সেখানে এই উদ্যোগ অন্তত একবেলা ভরপেট আহার নিশ্চিত করছে।
খুলনার এই ছোট্ট মানবিক উদ্যোগ ইতোমধ্যেই বহু মানুষের চোখে আশার আলো জ্বালিয়েছে। স্থানীয়রা মনে করেন, সমাজে যদি এ ধরনের পদক্ষেপ আরও বাড়ে, তাহলে একদিন হয়তো ‘খালি পেট’ শব্দটাই হারিয়ে যাবে। খুলনার ‘গরিবের ফ্রি বুফে’ তাই শুধু একবেলা খাবার নয়—এটি মর্যাদা, সম্মান আর মানবিকতার এক নতুন সামাজিক দৃষ্টান্ত।