
নিজস্ব প্রতিবেদক
খুলনা মহানগরীর অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার এম এ বারি সড়ক—স্থানীয়ভাবে পরিচিত ময়ূর ব্রিজ সংলগ্ন সড়ক—দীর্ঘদিন ধরে চরম অবহেলা ও সংস্কারহীনতার শিকার হয়ে নগরবাসীর জন্য এক ভয়াবহ ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার ভারী যানবাহন চলাচল করা সত্ত্বেও সড়কটির ভগ্নদশা নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় বাড়ছে দুর্ঘটনা, স্থবির হয়ে পড়ছে নগর যোগাযোগ এবং মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে সাধারণ মানুষ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই সড়কের বেহাল দশায় ব্যাহত হচ্ছে খুলনার প্রধান হাসপাতালগুলোতে জরুরি রোগী পরিবহন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কের অধিকাংশ অংশের পিচ উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ভারী যানবাহন এসব গর্তে পড়ে প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ছে। উঁচু-নিচু ও এবড়োখেবড়ো সড়কে চলাচল করতে গিয়ে রিকশা, ইজিবাইক ও মোটরসাইকেল আরোহীরা নিয়মিত দুর্ঘটনার মুখে পড়ছেন। রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলোর অভাবে সড়কটি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে, যা প্রতিদিনই নতুন দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি করছে।
সড়কটির আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো ধুলাদূষণ। শুষ্ক মৌসুমে ভারী যান চলাচলের ফলে উড়তে থাকা ধুলায় পুরো এলাকা সারাক্ষণ আচ্ছন্ন থাকে। এতে পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, দোকানের মালামাল ও বাসাবাড়ির আসবাবপত্র সবসময় ধুলায় ঢেকে থাকে। একই সঙ্গে বাড়ছে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি ও ফুসফুসজনিত রোগ।
জরুরি স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও এই সড়ক এখন বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ নগরীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রোগী পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ রুট এটি। কিন্তু সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে অ্যাম্বুলেন্স চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এক অ্যাম্বুলেন্স চালক জানান, ঝাঁকুনির কারণে অনেক সময় রোগীর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। যেখানে ১০ মিনিটে পৌঁছানোর কথা, সেখানে আধা ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে। যানজটে আটকে পড়ে রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ার ঘটনাও ঘটছে।
বৃষ্টির দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। সামান্য বৃষ্টিতেই গর্তগুলো কর্দমাক্ত ডোবায় পরিণত হয়। কোথায় গর্ত আর কোথায় সমতল—তা বোঝা যায় না। এতে ভারী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান উল্টে গিয়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়, যা পুরো শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কার্যত অচল করে দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রহিম উদ্দিন বলেন, “আমরা এখানে প্রতিদিন নরক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। ধুলায় দম নেওয়া যায় না, আর বৃষ্টি হলে কাদার কারণে হাঁটাও অসম্ভব। দ্রুত এই রাস্তাটি টেকসইভাবে সংস্কার না করলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা অনিবার্য।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আশরাফুল ইসলাম বলেন, “দীর্ঘদিন এ ধরনের ধুলাদূষণের মধ্যে বসবাস করলে মানুষের ফুসফুসে স্থায়ী জটিলতা দেখা দিতে পারে। শিশু ও বয়স্কদের জন্য ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। অবিলম্বে সড়ক সংস্কার ও নিয়মিত পানি ছিটানোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”
খুলনা নগরীর এই গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ধমনিকে সচল রাখতে এবং জনস্বাস্থ্য ও নগর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, এলজিইডি এবং সিটি কর্পোরেশনের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। নগরবাসীর প্রত্যাশা—কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে এই ‘মরণফাঁদ’ থেকে খুলনাকে মুক্ত করবে।
NGS/MMH