
মোঃ মনিরুজ্জামান চৌধুরী নড়াইল
নড়াইল জেলার কালিয়ার নড়াগাতী থানার চাপাইল গ্রামের বাসিন্দা ও ‘জুলাই আন্দোলনে’ পুলিশের গুলিতে আহত ছাত্রনেতা সিফায়েত চৌধুরী উন্নত চিকিৎসার অভাবে দিন কাটাচ্ছেন মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায়। একসময় গোপালগঞ্জ বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজের মেধাবী মাস্টার্স শিক্ষার্থী থাকলেও বর্তমানে তিনি প্রায় কথাবার্তা বলতে অক্ষম, বিছানার এক কোণে পড়ে আছেন বিমর্ষ ও নিঃসহায়ভাবে।
২০২৩ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অংশ হিসেবে ঢাকার নবীনগরে লংমার্চে অংশ নিতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন সিফায়েত। শরীরের বিভিন্ন অংশে ছররা গুলির আঘাত ও কানের পেছনে ঢুকে সামনের দিক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া একটি বুলেট তার জীবনযাত্রাকে সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। সেইদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা পেলেও পরবর্তী সময়ে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ পাননি তিনি।
বর্তমানে তার পরিবার বলছে, সিফায়েতের মানসিক অবস্থার ক্রমাবনতি ঘটছে। পরিবারের লোকজনকে তিনি অনেক সময় চিনতে পারেন না, কথা বলেন এলোমেলোভাবে। মাঝে মাঝেই মাথার ভেতরে ঝিঁ ঝিঁ শব্দ শুনে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন।
সিফায়েতের বাবা আছাদ চৌধুরী, একজন দরিদ্র কৃষক, বলেন, “ছেলের ঢাকায় অপারেশনের পর ওষুধ আনতে বলেছিল, কিন্তু টাকার অভাবে আর চালাতে পারিনি। এখন তার মাথার অবস্থা ভালো না, ভুলভাল কথা বলে। উন্নত চিকিৎসা দরকার, কিন্তু খাবার জোটাতে পারি না, ওষুধ কোথা থেকে আনব?” তার মা মিনি বেগম বলেন, “ছেলের ভবিষ্যতের চিন্তায় আমার শরীরটাই ভেঙে পড়ছে। দিনরাত শুধু ভাবি, আমাদের মরে গেলে ওর কী হবে?”
সিফায়েতের সেঝ ভাই সাফায়েত চৌধুরী জানান, “ভাইয়ের চিকিৎসা আর দেখাশোনার কারণে আমার ইমামতির চাকরিটাও চলে গেছে। সরকার কোথাও পাশে নেই। আগে লোকজন আসতো দেখতে, এখন কেউ খবর নেয় না। সরকারি অফিসে গেলে আমাদের মানুষই মনে করে না, দুর্ব্যবহার করে।” তিনি আরও জানান, “জুলাই ফাউন্ডেশন এক লাখ টাকা এবং জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে এক লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছিল। সবই চিকিৎসায় শেষ হয়ে গেছে। এখন না খেয়ে দিন কাটে।”
আঘাতপ্রাপ্ত সিফায়েত নিজেও কষ্ট নিয়ে বলেন, “কোনো সুবিধার আশায় আন্দোলনে যাইনি, বিবেকের তাড়নায় গিয়েছিলাম। গুলি খেয়ে ফিরে আসার পর থেকে শুয়ে আছি। এখন পরিবারের বোঝা হয়ে গেছি। আমি শুধু চাই, সুস্থ হয়ে আবার মানুষ হিসেবে বাঁচতে।”
আন্দোলনের সময় আহত হয়ে মানবেতর জীবন যাপনকারী সিফায়েত চৌধুরীর পরিবার সরকারের কাছে তার উন্নত চিকিৎসা ও একটি সম্মানজনক চাকরির দাবি জানিয়েছে। তারা বলছে, একজন রাজনৈতিক যোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব পালন করেছেন সিফায়েত, আর এখন রাষ্ট্রের উচিত তাকে সেই ত্যাগের সম্মান জানিয়ে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
এই মুহূর্তে মানবিক বিবেচনায় সরকার, জেলা প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে তার পরিবার।