
শেখ মাহতাব হোসেন, ডুমুরিয়া (খুলনা)
প্লাস্টিক, মেলামাইন আর সিলভারের রঙিন জিনিসপত্রে ভরে গেছে বাজার। হারিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের এককালীন গর্ব—মৃৎশিল্প। খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার গ্রামীণ হাটবাজারে এখন আর চোখে পড়ে না মাটির হাঁড়ি-পাতিল, সরা, কলসি কিংবা খেলনার দোকান। একসময় যেসব পণ্যে প্রতিটি গৃহস্থের রান্নাঘর ও উঠান ভরে থাকত, আজ সেগুলো যেন স্মৃতির ম্লান চিহ্ন।
ডুমুরিয়ার টিপনা, রান্নাই, চেচুড়ি, বুড়লি ও আশপাশের গ্রামের শতাধিক পরিবার পূর্বপুরুষের এই ঐতিহ্যবাহী পেশায় আজও যুক্ত থাকলেও দারিদ্র্য, কাঁচামালের সংকট, এবং বাজারে মাটির পণ্যের চাহিদা না থাকায় তাদের জীবন চলে চরম অনিশ্চয়তায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক পরিবার এখনো নিজেদের ঐতিহ্য বাঁচাতে লড়াই করছে। মেলায় বিক্রির জন্য তারা বানাচ্ছে ছোট ছোট মাটির পুতুল, খেলনা ও শোপিস। নারী সদস্যরা রঙের কাজ করে কাটাচ্ছেন ব্যস্ত সময়। অনেকেই বলছেন—এই কাজই তাঁদের শেষ ভরসা।
টিপনা নতুন রাস্তা বাজারের মৃৎশিল্প পণ্যের একমাত্র দোকানির জীবন পাল বলেন, “প্রায় ৩০ বছর ধরে ব্যবসা করছি। আগে নিজেরাই তৈরি করতাম। এখন আমাদের কুমাররা পেশা ছেড়ে দিচ্ছে, তাই অনেক জিনিস বাইরে থেকে আনতে হয়। প্লাস্টিক আর সিলভারের বাজারে আমরা টিকতে পারছি না।”
এক সময় ডুমুরিয়ার বিভিন্ন বাজারে মাটির হাঁড়ি-পাতিল, দইয়ের পাতিল, সরা, মালসা, চাড়ার টব, ফুলের টব, জলকান্দা, প্রতিমা, মাটির ব্যাংক, বাসন-কোসন, মুচি বাতি, খেলনা প্রভৃতি পণ্যের সমারোহ ছিল। আজ এসব স্থান দখল করেছে আধুনিক উপাদানে তৈরি পণ্য।
জানা যায়, মৃৎশিল্প ডুমুরিয়ায় চলে আসছে প্রায় দুই থেকে আড়াইশ’ বছর ধরে। একসময় গ্রামের মানুষের রান্নাবান্না থেকে শুরু করে পানির কলসি, দই জমানো হাঁড়ি পর্যন্ত সবই ছিল মাটির। এখন শহরের কিছু মানুষ শখ করে মাটির শোপিস বা টব ব্যবহার করলেও দৈনন্দিন ব্যবহারে এই শিল্পের স্থান নেই বললেই চলে।
তারপরও কুমার পরিবারগুলো হাল ছাড়েনি। তারা নতুন ডিজাইন, আকর্ষণীয় রঙ, এবং আধুনিক প্রয়োজনে মানানসই রূপ দিয়ে মাটির পণ্য তৈরি করছেন। অনেকেই বিশ্বাস করেন—মানুষের রুচির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উপস্থাপন করতে পারলে মৃৎশিল্প আবার ফিরে পাবে পুরোনো কদর।
ডুমুরিয়ার মাটির শিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি এই এলাকার সাংস্কৃতিক পরিচয়। এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণ। তা না হলে কয়েক প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই শিল্পের প্রদীপ নিভে যাওয়াটা সময়ের অপেক্ষা।