
শেখ মাহতাব হোসেন, ডুমুরিয়া, খুলনা
ডুমুরিয়ার গ্রামগুলো শীতকালের শুরুতেই নতুন এক রূপ ধারণ করে। শীতের আগমন ঘোষণা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গৃহিণীরা ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন কুমড়ার বড়ি তৈরি নিয়ে। ডুমুরিয়ার পাশাপাশি দেবহাটাসহ সাতক্ষীরা জেলাজুড়ে কুমড়ার বড়ি তৈরির প্রচলন বহু বছরের, তবে এ বছর শীতের শুরু থেকেই কাজের ব্যস্ততা noticeably বৃদ্ধি পেয়েছে।
শীতের মরশুমে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত অনেকেই কুমড়ার বড়ি তৈরি করে শুধুমাত্র পরিবারের জন্য নয়, জীবিকা নির্বাহের একটি উৎস হিসেবেও বেছে নিয়েছেন। দেবহাটা উপজেলার প্রায় প্রতিটি বাড়িতে দেখা যায়, শীত এলেই মাষকলাই ডালের সঙ্গে চালকুমড়া মিশিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে বড়ি তৈরি করা হয়। বড়ি দেওয়ার কাজ সাধারণত অগ্রহায়ণ মাস থেকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত চলে।
গৃহিণারা ভোরের কুয়াশায় দলবেঁধে বড়ি বসাতে শুরু করেন, তবে মূল প্রস্তুতি আগের দিন থেকেই শুরু হয়। বড়ি তৈরির প্রধান উপকরণ মাষকলাই ডাল এবং চালকুমড়া। এর সঙ্গে সামান্য মসলা ব্যবহার করা হয়। বাজারে প্রতি কেজি মাষকলাই ১৪০–১৫০ টাকা এবং চালকুমড়া ৩০–৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাধারণত ৬ কেজি চালকুমড়ার সঙ্গে ২ কেজি মাষকলাই মিশ্রণে বড়ি ভালো হয়।
প্রথমে মাষকলাই রোদে শুকিয়ে জাঁতায় ভেঙে খোসা ছাড়ানো হয় অথবা পানি দিয়ে ভিজিয়ে খোসা আলাদা করা হয়। প্রায় ৫–৬ ঘণ্টা ভিজানোর পর ঢেঁকি বা শিলপাটায় বেটে মিশ্রণ তৈরি করা হয়। তবে সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কুমড়ার বড়ি তৈরির মেশিন স্থাপনের পর থেকে মেশিন ব্যবহার করে মাষকলাই ও কুমড়া একসাথে মিহি করা হচ্ছে, যা শ্রমিকদের সময় ও শ্রম উভয়ই কমিয়ে দিয়েছে।
মিশ্রণ তৈরি হওয়ার পর মাঠ, আঙিনা, ছাদ বা খোলা জায়গায় কাপড়ে সারি সারি বড়ি বসানো হয়। প্রায় দুই-তিন দিন রোদে শুকানোর পর কাপড় থেকে তুলে পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়। সূর্যের আলো কম থাকলে শুকানোর সময় ৩–৪ দিন পর্যন্ত বাড়তে পারে।
জগন্নাথপুর গ্রামের ওজিলা বেগম জানান, “আগে আমরা ডাল মাটির মালশায় বেটে ফেসে ফেলতাম, এখন মেশিনে সব মিশিয়ে দিলে সময় ও শ্রম উভয়ই বাঁচে।” সখিপুর গ্রামের মাহমুদা বেগম বলেন, “কুমড়ার বড়ি গৃহিণীদের জন্য শীতকালীন রুটিনের মতো কাজ। এটি গ্রাম্য সমাজে একটি বিশেষ স্থান রাখে। তবে বড়ি দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত কুসংস্কারগুলোর সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।”
ডুমুরিয়া বাজারের মুদি দোকানদার এলাহি বক্স জানান, “শীতকালে বড়ি দেওয়ার জন্য কলাইয়ের ডালের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এবছর ডালের দামও কম থাকায় বিক্রি ভালো।” বর্তমানে ডালের দাম প্রায় ১৪৫–১৫০ টাকা কেজি প্রতি। শীতকালের এই প্রথাগত কার্যক্রম কেবল স্বাদের জন্য নয়, এটি গ্রাম্য জীবনের সঙ্গে মিলেমিশে এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও রূপ নিয়েছে।