
নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা
দীর্ঘ দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি খুলনার গুরুত্বপূর্ণ শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ। বারবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে, বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয়ও। কিন্তু প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কের বেহাল দশা কাটেনি। বর্ষায় কাদা-পানিতে আর শুকনো মৌসুমে ধুলাবালিতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পথচারীরা। এদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের পর খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) ১৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, খুলনা নগরীর রূপসা ট্রাফিক মোড় থেকে শিপইয়ার্ডের সামনে দিয়ে খানজাহান আলী সেতু (রূপসা সেতু) পর্যন্ত সড়কটি প্রশস্ত ও উন্নত করার উদ্যোগ নেয় কেডিএ। ২০১০ সালে প্রকল্পটির কার্যক্রম শুরু হলেও ২০১৩ সালের ৭ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। প্রাথমিকভাবে ২০১৫ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরে কয়েক দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। এতেও কাজ শেষ হয়নি।

শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ২০২০ সালের ২১ জুলাই প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বাড়িয়ে ২৫৯ কোটি ২১ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এরপর ২০২২ সালের ১২ জানুয়ারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান লিমিটেড ও মাহাবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগকে কার্যাদেশ দেয় কেডিএ। ওই বছরের ২০ জানুয়ারি কাজ শুরু হয়। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর মাহাবুব ব্রাদার্স কাজ অসমাপ্ত রেখে চলে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কেডিএ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্টে মাহাবুব ব্রাদার্সকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির পারফরম্যান্স গ্যারান্টি ও জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়। পরে ওই বছরের নভেম্বরে প্রকল্পের নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। সড়ক বিভাগের ২০২৩ সালের রেট শিডিউল অনুযায়ী নতুন করে প্রকল্প ব্যয় ২৮০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়। নতুন প্রস্তাবে সংযোগ সড়কের পুরো অংশ ঢালাই করার পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।
চলতি বছরের ৯ জুন প্রকল্পের তৃতীয় দফা সংশোধনী একনেকে উত্থাপন করা হলে দীর্ঘদিনেও কাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। সভা থেকে ২৮০ কোটি টাকার সংশোধিত প্রকল্পটি ফেরত পাঠানো হয় এবং প্রকল্পের বিলম্ব ও গাফিলতির কারণ অনুসন্ধানে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম এবং বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী। পরে ৪ জুলাই মন্ত্রিপরিষদ সচিব সরেজমিনে শিপইয়ার্ড সড়ক পরিদর্শন করেন।
তদন্তের পর গত ৩১ আগস্ট গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে ৪০৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয় বলে কেডিএর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে কেডিএর ১১ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কেডিএ চেয়ারম্যানের কাছে এবং সংস্থাটিতে প্রেষণে কর্মরত তিন উপসচিবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর খুলনা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের তৎকালীন সহকারী পরিচালক রকিবুল ইসলামের নেতৃত্বে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তিন সদস্যের একটি দল প্রকল্পের অনিয়ম ও গাফিলতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সরেজমিন অভিযান চালায়। পরে প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হলেও এ বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশনা পাওয়া যায়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সড়কটির দুরবস্থায় ক্ষোভ জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী অবস্থায় পড়ে থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পণ্য পরিবহনে বাড়তি খরচ হচ্ছে, পাশাপাশি প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। শিক্ষার্থীদেরও স্কুল-কলেজে যাতায়াতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
সড়কসংলগ্ন ব্যবসায়ী লিটন বলেন, ২০২১ সাল থেকে সড়কের কাজ শুরু হতে দেখছেন তিনি। কিন্তু কাজের মান ও অগ্রগতি নিয়ে তাঁদের অসন্তোষ রয়েছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। ধুলাবালির কারণে দোকানে বসা কঠিন হয়ে পড়েছে। গর্তের কারণে ইজিবাইক উল্টে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি জানান। দ্রুত কাজ শেষ করে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে এলাকাবাসীকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা ইকবাল মাহমুদ বলেন, এক বছরের কাজ এক যুগেও শেষ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। তাঁর মতে, কেডিএর পক্ষে কাজ শেষ করা সম্ভব না হলে অন্য কোনো সংস্থার মাধ্যমে হলেও দ্রুত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা উচিত।
ইজিবাইকচালক রেজাউল মিয়াও সড়কটির দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কাদার মধ্যে ইজিবাইক চালাতে গিয়ে গাড়ি উল্টে যায়, সাধারণ মানুষ পিছলে পড়ে। এমনকি বড় ট্রাকও দুর্ঘটনার শিকার হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই সড়কে গাড়ি চালাতে চালাতে তাঁর ইজিবাইকও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে কেডিএর সদস্য (এস্টেট) ও উপসচিব মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। নতুন করে দরপত্র আহ্বানের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে একনেকে সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত দরপত্র আহ্বান করা সম্ভব নয়। অনুমোদন পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ করা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
দীর্ঘদিনের প্রতিশ্রুতি ও একাধিক দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরও সড়কটির কাজ শেষ না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। এখন সংশোধিত প্রকল্পের অনুমোদন, নতুন দরপত্র এবং বাস্তব কাজ শুরুর অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা।
তথ্যসূত্র Jagonews24.com