
বাংলাদেশের শহরজীবন আজ জট, ধুলা, ধোঁয়া আর শব্দের ঘূর্ণিতে রুদ্ধশ্বাস। ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী—সব শহরের একই চিত্র: রাস্তা ভাঙা, ট্রাফিক সিগন্যাল অকার্যকর, অনিবন্ধিত ইজিবাইক ও রিকশার দখলে সড়ক, আর তার সঙ্গে অগণিত প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল ও আনফিট বাসের দাপট। প্রতিদিন সকাল-বিকেল ঘন্টার পর ঘন্টা মানুষ আটকে থাকে এই নগরজঞ্জালে। কাজের গতি থেমে যায়, জীবনের গতি হারায়। অথচ এই বিপর্যয়ের কারণগুলো অজানা নয়; অব্যবস্থাপনা, দায়িত্বহীনতা আর আইন অমান্য করার সংস্কৃতি মিলেই আজকের এই অচল শহর তৈরি করেছে।
শহরের প্রায় অর্ধেক সড়কে অনিবন্ধিত বা অবৈধ যানবাহন চলছে। কোনো রোড পারমিট নেই, কোনো ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই, তবু রাস্তায় চলছে নির্দ্বিধায়। স্থানীয় প্রভাবশালী, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া বা প্রশাসনিক শৈথিল্যের কারণে এই যানবাহনগুলো থামানো তো দূরের কথা, দিন দিন সংখ্যা আরও বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত রিকশার দাপট—যা শহরের সরু রাস্তা থেকে শুরু করে প্রধান সড়কেও চলাচল করছে। ফলে একদিকে যানজট, অন্যদিকে দুর্ঘটনার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে।
এই চিত্রের সঙ্গে জুড়ে আছে আরেক ভয়াবহ বাস্তবতা—রাস্তার বেহাল অবস্থা। কোথাও খোঁড়াখুঁড়ি শেষ হয় না, কোথাও মেরামতের কাজ শুরু হয় না। এক সংস্থা রাস্তা খুঁড়ে রাখে, অন্য সংস্থা তার দায় নেয় না। ফলে রাস্তায় তৈরি হয় গর্ত, ধুলা আর জলাবদ্ধতা। সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো শহর থমকে দাঁড়ায়। কিন্তু এসব দেখেও যেন কেউ জবাবদিহির প্রয়োজন বোধ করে না।
আরও উদ্বেগজনক হলো ট্রাফিক সিগন্যাল ও আইন না মানার সংস্কৃতি। বেশিরভাগ মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল অকার্যকর, আবার যেখানে আছে, চালকরা তা উপেক্ষা করে চলে। পথচারীরা ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে প্রাণ হাতে নিয়ে রাস্তা পার হয়। অনেক সময় দেখা যায়, ট্রাফিক পুলিশ একজন মোড়ে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে পাঁচ দিক সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। জনবল সংকট, প্রযুক্তির অভাব ও দায়িত্ববোধের ঘাটতি মিলেই ট্রাফিক ব্যবস্থাকে করেছে অকার্যকর।
এর পাশাপাশি বড় একটি সমস্যা হলো—বড় গাড়িগুলোর নির্দিষ্ট সময় ছাড়া শহরে প্রবেশ। বাইপাস সড়ক থাকা সত্ত্বেও ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও মালবাহী যানগুলো সকাল-বিকেল নির্বিচারে শহরে ঢুকে পড়ে। এতে অফিস সময়, স্কুল টাইম ও সন্ধ্যার সময় শহর পুরোপুরি স্থবির হয়ে যায়। অথচ নির্দিষ্ট সময়সীমা ও রুট নির্ধারণের মাধ্যমে এই জট অনেকাংশে কমানো সম্ভব ছিল।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে—আমাদের ট্রাফিক সংস্কৃতির অভাব। রিকশাচালক থেকে শুরু করে প্রাইভেটকার চালক পর্যন্ত সবাই মনে করেন, রাস্তাটা তাঁর একার। কেউ অন্যের কথা ভাবে না। অনেক চালক ট্রাফিক আইন জানেন না, জানলেও মানেন না। নাগরিক সচেতনতা নামমাত্র। সবাই তাড়াহুড়োয়, সবাই আগে যেতে চায়, ফলে কেউই যেতে পারে না। এই মানসিকতা না বদলালে কোনো আইনি পদক্ষেপও স্থায়ী সমাধান আনতে পারবে না।
এখন সময় এসেছে নগরজঞ্জালের এই অচল অবস্থা ভাঙার। আমাদের দরকার সমন্বিত, আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। প্রথমত, অনিবন্ধিত ও আনফিট যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কঠোর অভিযান চালাতে হবে। দ্বিতীয়ত, বড় গাড়ির শহরে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ও রুট কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। তৃতীয়ত, ট্রাফিক সিগন্যালগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তিতে নিয়ন্ত্রিত করতে হবে এবং পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করতে হবে। চতুর্থত, নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে স্কুল, গণমাধ্যম ও সামাজিক প্রচারের মাধ্যমে।
শহর মানে শুধু ভবন, ফ্লাইওভার বা আলোকসজ্জা নয়—শহর মানে শৃঙ্খলা, নিয়ম ও দায়িত্ববোধ। আমরা যদি এই বোধ ফিরিয়ে আনতে না পারি, তবে উন্নয়ন যতই হোক, শহরজীবন থেকে শান্তি হারিয়ে যাবে। জঞ্জাল, যানজট আর ধোঁয়াশার এই নগর থেকে মুক্তি পেতে হলে প্রশাসন, নাগরিক ও নীতিনির্ধারকদের সবাইকে একসঙ্গে ভাবতে হবে। এখন সময় কেবল উন্নয়নের কথা বলার নয়, জীবনের গতি ফিরিয়ে আনার। শহরকে চলার যোগ্য করতে হলে, আগে আইন, নীতি ও শৃঙ্খলার পথেই ফিরতে হবে।