
মনির খান, স্টাফ রিপোর্টার
নড়াইলের লোহাগড়া পৌরসভার গোপিনাথপুর গ্রামে এক ভয়াবহ প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে, যা শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও সম্মানহানির একটি বড় প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করেছে। অভিযোগ রয়েছে, নড়াগাতি থানার মাউলী ইউনিয়নের কাঠাদুরা গ্রামের লতিফ কাজী ও তার ছেলে রাসেল কাজী সৌদি আরবে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়ে প্রবাসী শ্রমিকদের ফাঁদে ফেলেছেন। নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন অনেকে, তাদের মধ্যে অন্যতম মোঃ রানা শেখ (২২)।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রানা শেখের পিতা মোঃ হান্নান শেখের সঙ্গে লতিফ কাজীর একটি চুক্তি হয়। লতিফ কাজীর ছেলে রাসেল কাজী সৌদি প্রবাসী থাকায় তিনি ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় “ফ্রি ভিসা” ও সৌদি আরবে কাজের ব্যবস্থা করার কথা বলেন। চুক্তি অনুযায়ী, হান্নান শেখ ৪ লাখ টাকা নগদ প্রদান করেন, বাকি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা রানা শেখ কাজের মাধ্যমে পরিশোধ করার শর্ত থাকে।
২০২৫ সালের ১৮ মে রানা শেখ সৌদি প্রেরণ করা হয়। কিন্তু সেখানে তার জীবনের বাস্তবতা চুক্তি থেকে ভিন্ন ছিল। প্রথমে তাকে লোহা ও স্টিল ভাঙার কঠিন শ্রমের কাজ দেওয়া হয়। চার দিনের মধ্যে তাকে মক্কায় পাঠানোর কথা থাকলেও, ৫০০ কিলোমিটার যাওয়ার পর জানানো হয় “ডিমান্ড বাতিল” এবং ফিরে আসতে হবে। এরপর রাসেল কাজী রানা শেখের পাসপোর্ট জব্দ করে তাকে রাস্তায় কাজ করতে বাধ্য করেন। অসুস্থ অবস্থায়ও চিকিৎসা নয়, বরং ন্যূনতম খাবারের সুবিধাও দেওয়া হয়নি।
রানা শেখের অভিজ্ঞতা বিষণ্ণ। পাঁচ মাসের শ্রমজীবনে তিনি এক টাকাও বেতন পাননি, খাবারের ব্যবস্থা ছিল অনিয়মিত—কখনো এক বেলা, কখনো দুই দিন পর্যন্ত খাওয়া পাননি। অবশেষে নির্যাতনের কথা জানতে পেরে রানা শেখের বাবা সোনার গহনা বন্ধক রেখে ৬০ হাজার টাকা পাঠান। এর মধ্যে ৫৫ হাজার টিকিট কাটতে রাখা হয় এবং ৫ হাজার টাকা রানা শেখকে হাতে দিয়ে ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
হান্নান শেখ অভিযোগ করেন, “লতিফ কাজী ও রাসেল কাজী আন্তর্জাতিক মানের প্রতারক। শুধু আমার ছেলে নয়, এমন প্রায় অর্ধশত মানুষ তাদের ফাঁদে পড়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।” তিনি জানান, এ বিষয়ে থানায় ও আর্মি ক্যাম্পে অভিযোগ দায়ের করবেন এবং ক্ষতিপূরণ ও টাকা ফেরতের দাবি করবেন।
স্থানীয়রা বলেন, “এ ধরনের প্রতারণা শুধু এক ব্যক্তির নয়, এটি দেশের প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে হুমকির মুখে ফেলে।” স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী ও শ্রমিক সংগঠনগুলোও ঘটনাটিকে একটি “মানবপাচার ও প্রতারণার গুরুতর মামলা” হিসেবে দেখছেন এবং দ্রুত তদন্ত ও অভিযুক্তদের শাস্তির দাবি করছেন।
আইনজীবীরা বলছেন, এই ধরনের ঘটনা “মানবপাচার, শ্রম পাচার ও প্রতারণা” বিভাগে পড়ে এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বিচারের যোগ্য। এ ধরনের অপরাধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে “মানবপাচার” ও “শ্রমিক নির্যাতন” আইনে মামলা হতে পারে।
এ ঘটনা শুধু একটি পারিবারিক বা স্থানীয় সমস্যা নয়। এটি দেশের প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার বড় উদাহরণ। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে প্রেরিত প্রবাসীদের সুরক্ষা ও ন্যায্য শ্রম অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারি তৎপরতা ও কঠোর নীতি প্রয়োজন।
রানা শেখের কষ্টের কাহিনী একটি সতর্কবার্তা—যে কোনো প্রবাসী শ্রমিক প্রতারণা ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে পারে। তাই প্রবাসী প্রেরণে আন্তরিকতা, স্বচ্ছতা ও সরকারের তত্ত্বাবধান অপরিহার্য। নড়াগাতীতে আদম ব্যাপারীর ফাঁদ শুধু একটি ঘটনা নয়; এটি একটি সঙ্কেত যে প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।