
নিজস্ব প্রতিবেদক
নবগঙ্গা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের স্বপ্ন দেখেছিলেন দুই পাড়ের মানুষ। তাঁদের আশা ছিল, সেতুটি চালু হলে নদী পারাপারের ভোগান্তি কমবে, সহজ হবে যোগাযোগ, বাড়বে ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় সেই স্বপ্ন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার ফেদী বাজার ঘাটে নবগঙ্গা নদীর ওপর সেতুর কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় দুই পাড়ের লক্ষাধিক মানুষকে পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় প্রতিদিন ছোট নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন রোগী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারী মানুষ। নদী পারাপারে সময় ও অর্থ—দুটিই বাড়ছে। অথচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল এবং ৩৪ লাখ টাকা জরিমানা করার পরও সেতুর বাকি কাজ এখনো শুরু হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সেতুটি নির্মাণের জন্য ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে যশোরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আইসিএলকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৩ সালের অক্টোবরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় কয়েক দফা সময় বাড়ানো হয়। সর্বশেষ সময়সীমা ছিল ২০২৬ সালের জুন। এরপরও সেতুর পুরো কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, সেতুর প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি রয়েছে ৩০ শতাংশ। এ পর্যন্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৭ কোটি ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হওয়ায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) আইসিএলের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটিকে ৩৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এখন বাকি কাজ শেষ করতে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সেতুর অভাবে নদী পারাপারের বর্তমান ব্যবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। ফেদী বাজার ঘাটে ছোট দুটি নৌকায় মানুষ পারাপার হচ্ছে। যাত্রী বেশি হলে অপেক্ষা করতে হয়, আর প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নদী পারাপার নিয়ে বাড়তি ঝুঁকিতে পড়তে হয় স্থানীয়দের। সেতুটি চালু হলে লোহাগড়ার পাঁচটি ইউনিয়নের মানুষের জেলা সদরে যাতায়াত সহজ হওয়ার কথা। কিন্তু কাজের দীর্ঘসূত্রতায় সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁরা।
ফেদী বাজারের মুদি ব্যবসায়ী দুলাল মোল্যা বলেন, ঘাটে মাত্র দুটি ছোট নৌকায় মানুষ পারাপার হয়। এতে প্রতিদিনই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। নদী পার হতে গিয়ে মানুষকে ঝুঁকি নিতে হয়। বিকল্প পথে যাতায়াত করলে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ে। দ্রুত সেতুর কাজ শেষ করে চলাচলের উপযোগী করার দাবি জানান তিনি।
ভূমুরদিয়া বাজারের পাট ব্যবসায়ী আনিস সরদার বলেন, সেতুটি নির্মিত হলে এলাকার মানুষের যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কাজ পড়ে থাকায় সাধারণ মানুষ প্রত্যাশিত সুবিধা পাচ্ছেন না। দ্রুত নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করে কাজ শুরু এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণ শেষ করার দাবি জানান তিনি।
নড়াইল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার ইকরামুল কবীর বলেন, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আইসিএলের চুক্তি বাতিল করা হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে ৩৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। সেতুর বাকি ৩০ শতাংশ কাজ শেষ করতে আনুমানিক ৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন দরপত্র আহ্বায়ের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। নতুন ঠিকাদার নিয়োগের পর দ্রুত কাজ শুরু করা হবে বলে তিনি জানান।
সেতুটি ঘিরে এলাকার মানুষের প্রত্যাশা এখন একটাই—প্রশাসনিক পদক্ষেপ যেন দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়। চুক্তি বাতিল ও জরিমানার পর নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া শেষ করে নির্মাণকাজ শুরু হলে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তির পথ তৈরি হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, আর সময়ক্ষেপণ নয়; দ্রুত কাজ শেষ করে নবগঙ্গা সেতু জনসাধারণের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হোক।