
শেখ ফসিয়ার রহমান, নড়াইল জেলা প্রতিনিধি
বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী নড়াইলে যথাযোগ্য মর্যাদা ও নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) সকাল ৯টায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শিল্পীর স্মৃতিবিজড়িত সুলতান সংগ্রহশালা চত্বরে তাঁর সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন, কোরআন খতম, দোয়া ও মোনাজাত, শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এসব কর্মসূচিতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জেলা প্রশাসন, এস এম সুলতান বেঙ্গল চারুকলা মহাবিদ্যালয়, এস এম সুলতান ফাউন্ডেশন, এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা, নড়াইল প্রেসক্লাব, জেলা শিল্পকলা একাডেমি, এস এম সুলতান শিশু চারু ও কারুকলা ফাউন্ডেশন এবং মূর্ছনা সংগীত নিকেতনসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে শিল্পীর সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করা হয়। দিনব্যাপী আয়োজনে শিল্পীর জীবন, কর্ম, শিল্পদর্শন এবং বাংলাদেশের চিত্রকলায় তাঁর অসামান্য অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে শিল্পীর সৃজনশীলতা ও শিল্পভাবনা তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নড়াইলের জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ আবদুল ছালাম, জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাফিজুর রহমান আলেক, নড়াইল জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল ফজল মুহাম্মদ মশিউর রহমান বাবু, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আহসান মাহমুদ রাসেল, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা টি এম রাহসিন কবির, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বিমানেশ চন্দ্র বিশ্বাস, এস এম সুলতান ফাউন্ডেশনের সাবেক সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট ইকবাল হোসেন সিকদার, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুব মুর্শেদ জাপল, বিএনপি নেতা মুন্সী শাহিন উল্লাহ মোহন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নড়াইল জেলা কমিটির সদস্যসচিব প্রকৌশলী মাহমুদা সুলতানার রিমি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শেখ হানিফ, এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালার কিউরেটর তন্দ্রা মুখার্জি, সহকারী কিউরেটর মেহেদী হাসান রানা, নড়াইল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রশিদ লাবলু, শিশুস্বর্গের প্রশিক্ষক চিত্রশিল্পী সৌমিত্র মোস্তবী, প্রশিক্ষক চিত্রশিল্পী চিরঞ্জিত রায় এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নড়াইল শাখার সদস্যসচিব আমিরুল ইসলাম রানাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে বাবা মেছের আলী ও মা মাজু বিবির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন এস এম সুলতান। শৈশব থেকেই শিল্পের প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে চিত্রকলার জগতে নিয়ে আসে। পরবর্তী সময়ে স্বতন্ত্র শিল্পভাষা, ব্যতিক্রমী ভাবনা এবং মানুষের জীবনসংগ্রামকে ক্যানভাসে তুলে ধরার অসাধারণ দক্ষতায় তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর চিত্রকর্মে বাংলার কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, গ্রামীণ জীবন এবং মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও সম্ভাবনা বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর শিল্পকর্ম শুধু নড়াইল বা বাংলাদেশের সম্পদ নয়, বরং বিশ্বশিল্পাঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।
১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তি শিল্পী। চিত্রকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে রেসিডেন্ট আর্টিস্ট স্বীকৃতি, ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। এ ছাড়া ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ম্যান অব দ্য ইয়ার’, নিউইয়র্কের বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার থেকে ‘ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট’ এবং এশিয়া উইক পত্রিকা থেকে ‘ম্যান অব এশিয়া’সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হন তিনি।
এস এম সুলতানের শিল্পকর্ম ও জীবনদর্শনকে ধারণ করে তাঁর স্মৃতি সংরক্ষণ এবং দেশের শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে। ২০০১ সাল থেকে এস এম সুলতান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গুণী চিত্রশিল্পীদের সৃজনশীল অবদানের স্বীকৃতি দিতে সুলতান স্বর্ণপদক প্রদান করা হচ্ছে। মৃত্যুবার্ষিকীর এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে শিল্পীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের মধ্যে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা ও তাঁর জীবনদর্শন ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।