
কক্সবাজার থেকে: কামরুন তানিয়া
কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থিত ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প এখন দেশের অন্যতম অপরাধকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মাদক পাচার, অপহরণ, চাঁদাবাজি, মানব পাচার ও হত্যাসহ নানা অপরাধে প্রতিদিন নতুন নতুন অভিযোগ উঠছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালেও অন্তত ১০টি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ এখনও সক্রিয় রয়েছে।
২০১৭ সালের পর থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমেই বেড়েছে। বর্তমানে উখিয়া-টেকনাফের ক্যাম্পগুলোতে ২১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে, যা স্থানীয় জনসংখ্যার চারগুণ। এই জনঘনত্ব স্থানীয় পরিবেশ, কৃষিজমি ও জলবায়ুর ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। জেলা পুলিশের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ক্যাম্পগুলোতে হত্যা, মাদক, অপহরণ ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধে ২৫০টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ১৮টি, মাদক মামলা ১৫০টি, অপহরণ মামলা ৫০টি এবং ধর্ষণ মামলা ১২টি। ২০১৭ সাল থেকে গত আট বছরে ৩০০ জনের বেশি রোহিঙ্গা খুন হয়েছেন; দায়ের হয়েছে ২৮৭টি হত্যা মামলা।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ দফতর (ইউএনওডিসি) জানিয়েছে, বাংলাদেশে প্রবেশ করা মাদকের মাত্র ১০ শতাংশ ধরা পড়ে। অপরদিকে আঙ্কটাডের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকার মাদক পাচার হয়। সীমান্তবর্তী ক্যাম্পগুলোকে ব্যবহার করে মিয়ানমারের আরাকান আর্মি ও অন্যান্য গোষ্ঠী ইয়াবা ব্যবসা চালাচ্ছে।
টেকনাফের লেদা ক্যাম্পের বাসিন্দা কালা মিয়া জানান, গত মে মাসে তাকে অপহরণ করে ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। শেষ পর্যন্ত ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার পর তিনি মুক্তি পান। একইভাবে সাবের আলম নামের অপর এক বাসিন্দাকে ৪০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনা হয়। ক্যাম্পবাসীদের অভিযোগ, মুক্তিপণ আদায়ের জন্য বিশেষ করে টেকনাফের আবদুল হাকিম বাহিনী বেশি সক্রিয়। মুক্তিপণ না দিলে হত্যার পর লাশ গুম করার ঘটনাও ঘটছে।
রোহিঙ্গা নেতাদের তথ্যমতে, গত এক বছরে ক্যাম্পগুলোতে শতাধিক নতুন মাদক আখড়া গড়ে উঠেছে। বর্তমানে চার শতাধিক স্থানে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক বিক্রি ও সেবন চলছে। এতে যুবসমাজ বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক জানান, “১৩টি ক্যাম্পে প্রায় ১৪ লাখ রোহিঙ্গা থাকলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে এত বিপুল জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করা দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে।”
স্থানীয়দের মতে, রোহিঙ্গা সমস্যা এখন উখিয়া-টেকনাফের মানুষের জীবনযাত্রা ও নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। দ্রুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে বলে মনে করেন এলাকাবাসী।