
নিজস্ব প্রতিবেদক, হরিণাকুণ্ডু | ঝিনাইদহ, ২০২৬
এক সময় যেখানে শুধু অথৈ জল আর কচুরিপানার রাজত্ব ছিল, আজ সেখানে দিগন্তজোড়া সবুজের সমারোহ। ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় মাঠগুলোতে এখন দোল খাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন—পেঁয়াজ এবং রসুন। ২২৭.৬২ বর্গ কিলোমিটারের এই জনপদ দেশের অন্যতম প্রধান ‘মশলা ভাণ্ডার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
ভৌগোলিকভাবে উচ্চভূমি হলেও কুমার ও নবগঙ্গা নদীবেষ্টিত এই উপজেলায় রয়েছে রঘুনাথপুর, ফলসী ও কাপাশাটিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ কাকল বিল ও দাদুয়ার বিল। ২০০০ সালের আগে যেখানে জলাবদ্ধতার কারণে বছরে মাত্র একবার আমন ধান চাষ হতো, আজ আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ছোঁয়ায় কৃষকরা বছরে তিনটি ফসল ঘরে তুলছেন।
বিগত কয়েক বছরের অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কৃষকরা থেমে থাকেননি। তাঁরা বেছে নিয়েছেন আগাম পেঁয়াজ ও রসুন চাষ, যা পুরো উপজেলার কৃষি অর্থনীতির ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে ভূমিকা রেখেছে।
হরিণাকুণ্ডুর এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে এক অনুপ্রেরণার গল্প। ১৯৯৬ সালে কাকল বিলের সোহাগপুর অংশে কৃষক কাবিল উদ্দিন প্রথমবার স্বল্প পরিসরে পেঁয়াজ চাষের ঝুঁকি নেন। তাঁর সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে পুরো উপজেলার কৃষকরা পেঁয়াজ-রসুন চাষে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ২০১৩ সালে খুলনা বিভাগে পেঁয়াজ উৎপাদনে শীর্ষস্থান দখল করে সোহাগপুরের কৃষকরা। সেই থেকে পেঁয়াজ ও রসুনই হরিণাকুণ্ডুর মানুষের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে।
সরেজমিনে মাঠ পরিদর্শনে দেখা যায়, পেঁয়াজ তোলার ধুম পড়েছে। কৃষক আল আমিন হোসেন জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার বাম্পার ফলনের আশা করছেন তারা। কাকল ও দাদুয়ার বিলে প্রতি শতাংশে পেঁয়াজ হচ্ছে ১.৫ থেকে ২ মণ, আর রসুন প্রতি শতাংশে ফলন মিলছে ১ থেকে ১.৫ মণ।
তবে সফলতার মাঝেও উদ্বেগের সুর শোনা যায়। সার, কীটনাশক ও নিড়ানি শ্রমিকের বাড়তি মজুরি কৃষকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। কৃষকরা দাবি করেন—মৌসুমে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখার মাধ্যমে দেশি পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি সহযোগিতা বাড়ানো হোক।
বর্তমানে প্রায় ২৩০০ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিকভাবে পেঁয়াজ-রসুন উৎপাদন হচ্ছে। স্থানীয় কৃষিবিদদের মতে, সঠিক হিমাগার ব্যবস্থা এবং সরকারি সহযোগিতা পেলে হরিণাকুণ্ডু শুধু দেশের চাহিদা মেটাবে না, বরং বিদেশেও মশলা রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখতে পারবে।
এই ধরনের কৃষি উন্নয়ন হরিণাকুণ্ডুকে কেবল স্বপ্নজয়ী মাঠ নয়, দেশের খাদ্য ও মশলা নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।