
মোঃ শিহাব উদ্দিন, গোপালগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি
সৌদি আরবে কর্মরত প্রায় একশত বাংলাদেশি শ্রমিকের কয়েক কোটি টাকা বেতন আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে গোপালগঞ্জ জেলার এক প্রবাসীর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পূর্ব নিজড়া গ্রামের বাসিন্দা মামুন শেখ ওরফে সাগর, পাসপোর্ট নম্বর EM0326785, সৌদি আরবে ACT ও AGC নামের দুটি সাপ্লায়ার কোম্পানির মালিক পরিচয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীদের মাধ্যমে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রবাসীরা জানান, মামুন সাগরের মাধ্যমে সৌদি আরবের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ পেলেও মাসের পর মাস বেতন বুঝে পাননি তারা। মূল কোম্পানি থেকে বেতন আদায় করেও তিনি তা শ্রমিকদের না দিয়ে আত্মসাৎ করে পালিয়ে গেছেন। প্রায় ১০০ প্রবাসীর প্রত্যেকে ৩ থেকে ৫ মাসের বেতন বকেয়া অবস্থায় রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সর্বমোট আত্মসাতের পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৫০ লক্ষ থেকে ৩ কোটি টাকা।
সৌদি আরব থেকে পাঠানো ভিডিও বার্তায় ভুক্তভোগীরা জানান, অনেকেই খেয়ে না খেয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বাসাভাড়া মেটাতে বাধ্য হয়ে দেশ থেকে টাকা আনতে হয়েছে। কেউ কেউ কাজ ছেড়ে বাড়ি ফেরার টাকাও জোগাড় করতে পারছেন না।
গোপালগঞ্জ জেলা সদরের ভুক্তভোগী শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমি রিয়াদে একটি সোলার প্ল্যান্টে কাজ করতাম AGC সাপ্লায়ারের মাধ্যমে। তিন মাসের বেতন—৯ হাজার রিয়াল, অর্থাৎ প্রায় ৩ লক্ষ টাকা—AGC পরিচালক মামুন আত্মসাৎ করেছে। অথচ সে দেশে গিয়ে আমাদের টাকা দিয়ে ঢাকায় কাপড়ের ব্যবসা করছে তার বোন জামাই আল-আমিন সোহেলকে দিয়ে।”
তিনি আরও জানান, মামুনের এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িত তার স্ত্রী রিতু, ভাই সোহাগ ও শ্বশুর মনির মোল্লাও। মামুনের শ্বশুরবাড়ি গোপালগঞ্জ সদরের ঘোষের চর মৌলভীপাড়ায়।
রাজবাড়ী জেলার রেজাউল মল্লিক বলেন, “আমি সৌদির রিয়াদে কাজ করছিলাম AGC নামের সাপ্লায়ারের অধীনে। তিন মাসের বেতন দেয়নি মামুন। এখন শুনছি সে মদিনায় আত্মগোপনে আছে।”
গোপালগঞ্জ টুঙ্গিপাড়ার হানিফ শেখ বলেন, “আমি পাঁচ মাস হলো এসেছি। শুরু থেকেই ACT কোম্পানির মাধ্যমে কাজ করছিলাম। এক মাসের বেতনও পাইনি। দিনরাত ১৪ ঘণ্টা কাজ করে এখন খাওয়ার টাকাও নেই। দেশ থেকে টাকা এনে বাসাভাড়া দিচ্ছি।”
টুঙ্গিপাড়ার বাশবাড়িয়ার ভুক্তভোগী তুহিন বলেন, “তিন মাস কাজ করার পর বেতন চাইলে মামুন বলেছে, ‘তোদের পেটে ভাতে কাজ করিয়েছি, তোদের কোনো আকামা নাই।’ আমাদের এখন খাবারও নেই, বাসায় ফেরার টাকাও নেই।”
নারায়ণগঞ্জের এক ভুক্তভোগী জানান, তিনি মামুনের মাধ্যমে কাজ পেয়েও কোনো বেতন না পেয়ে বরখাস্ত হয়েছেন। তার ভাষ্য, “আমরা এখানে মানবতার জীবনযাপন করছি। আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”
ভুক্তভোগীরা বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন—প্রতারক মামুন ও তার সহযোগীদের আইনের আওতায় এনে আমাদের কষ্টার্জিত টাকা ফেরত দেওয়া হোক এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
সৌদি থেকে কাঁদতে কাঁদতে ভিডিও বার্তায় প্রবাসীরা বলছেন: “আমরা দেশের জন্য বিদেশে কষ্ট করছি, আজ আমরা টাকার জন্য পথে বসেছি—আমাদের পাশে দাঁড়ান।”