
মোঃ মনিরুজ্জামান চৌধুরী নড়াইল
সিকদার আলী আফজাল গ্রামঃ পহরডাঙ্গা, থানাঃ নড়াগাতী, উপজেলাঃ কালিয়া, জেলাঃ নড়াইল।
১। সশস্ত্রবাহিনীর বিভিন্ন বিভাগে কমিশন র্যাংকে চাকরীর জন্য দরখাস্ত চালিয়ে যাই। পদাতিক ও নৌবাহিনীতে কমিশনের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে দুবার আই.এস.এস.বি. এর সম্মুখস্থ হই – ১৯৭০ সালের প্রথম দিকে। তখন পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। শেখ মুজিব ও তাঁর আওয়ামী লীগ ৬ দফার প্রচারসহ জনপ্রিয়তার শিখরে। আই.এস.এস.বি.তে ৬ দফার উপর লিখিত ও মৌখিক প্রশ্ন করা হয়। আমি তো আওয়ামী লীগের ৬ দফার দাবীতে সোচ্চার। বুঝতে অসুবিধা হলো না – আমি সঠিক উত্তর দিলে আমাকে নির্বাচন করা হবে না। আবার, মিথ্যা বলতেও চাই না। আমি এও বুঝে ফেলি, ৬ দফার দাবী ন্যায্য, ব্যাখ্যাসহ একথা বললে যদি আমাকে নির্বাচন না করা হয়, তবে পাকিস্তানের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও ক্ষমতা পাবে না। রাং, এ জটিল পরিস্থিতিতে ৬ দফার দাবী ব্যাখ্যাসহ ন্যায্য বললাম। তাই, চূড়ান্তভাবে যোগ্য হয়েও নিয়োগ পত্র না পেয়ে খুব খুশী হলাম।
২। তখন জাতীয় ভিত্তিক মেডিকেল ল্যাবরেটরী টেকনিশিয়ান সিলেকশন চূড়ান্ত পরীক্ষায় সারা পাকিস্তানে ফার্ষ্ট হয়ে নিয়োগপত্র পেয়েও পশ্চিম পাকিস্তানে যেয়ে চাকরীতে যোগদান করলাম না। চাকরীর জন্য পূর্ব-পাকিস্তানের গভর্নর ভাইস এডমিরাল এ.এস.এম. আহসানকে আমি ব্যক্তিগত পত্র লিখি। তিনি জবাব পাঠিয়ে আমাকে তাঁর সচিবের সাথে দেখা করার পরামর্শা দেন; কিন্তু, তখনকার জটিল পরিস্থিতিতে তাঁর সচিবের সাথে দেখা করি নাই।
৩। বাংলাদেশ কৃষিবিশ্ববিদ্যালইয়ে কৃষি-অর্থনীতি ফ্যাকাল্টিতে ১৯৭০-৭১ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হয়ে ক্লাশ করছি। কিন্তু, একটা চাকুরীর খুবই দরকার ছিল। এখানে একটা ব্যাপার উল্লেখযোগ্য। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মেডিকেল অফিসার জনাব আব্দুস সামাদ আমার বড় দুলাভাই। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার বংগবন্ধুকে তিনি সম্ভাব্য সহযোগিতা করতেন। তাই, তাঁর প্রতি বংগবন্ধু খুবই কৃ্তজ্ঞ ছিলেন। তাঁরা খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। জনাব আব্দুস সামাদ ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বংগবন্ধুর বাসায় বেড রূমে আমাকে নিয়ে গেলেন। তিনি আমার প্রশংসা করে আমার চাকুরীর জন্য জোর সুপারিশ করলেন। তিনি জানান যে ডিসেম্বর ১৯৭০ এর নির্বাচনের আগে আমার চাকুরীর সুপারিশ করলে নির্বাচনের উপর খারাপ প্রভাব পড়বে। তিনি প্রতিশ্রুতি দিলেন যে নির্বাচনের পরে তিনি আমাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার দায়িত্ব ব্যক্তিগতভাবে নেবেন।
৪। ১২ই নভেম্বর তারিখ রাতে প্রলয়ংকারী ঝড়। খবরে প্রকাশ, পটুয়াখালী, বরিশাল ও অন্যান্য দক্ষিণাঞ্চলে বন্যার পানিতে ডুবে ৮ থেকে ১০ লক্ষ লোকের মৃত্যু হয়েছে। লক্ষ লক্ষ গবাদি পশু মরে গেছে। ভারতসহ বন্ধু ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সরকার প্রধানগণ দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শন করে সাহায্য ও ত্রান সামগ্রী প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খাঁন সরেজমিনে পরিদর্শন করলেন না। তখন খবরের কাগজে বড় বড় হেডিঙে লেখা হলোঃ বন্ধু এলো, শত্রু এলো, ভাইতো এলো না। আপামর জনতা বংগবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে একতাবদ্ধ হলো।
৫। ১৯৭০ এর নির্বাচনে বংগবন্ধুর আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল। কৃষিবিশ্ববিদ্যালইয়ে নিয়মিত ক্লাশ করছি। একই সাথে রাজনৈতিক অবস্থা কি হয় তা পর্যবেক্ষণ করছি। বুঝতে পারি, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খাঁন বংগবন্ধু শেখ মুজিব রহমানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন না; ইয়াহিয়া খাঁনরা তাঁর নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ষঢ়যন্ত্রে লিপ্ত হন। তাই, নির্বাচনের পরে সারাদেশে আন্দোলন। আমাদের প্রতিটা মিছিলে স্বাধীন বাংলার পতাকা হাতে আমি সর্বদা আগে থাকতাম।
৬। ৩রা মার্চে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের অধিবেশন খুব সম্ভত ১লা মার্চে স্থগিত ঘোষণা করা হয়। সাথে সাথে আমরা ক্লাশ থেকে বের হয়ে রাজপথে নেমে প্রায় ১ মাইল লম্বা মিছিল করে ময়মনসিংহ শহর অভিমুখে বিভিন্ন স্লোগান তুলে প্রতিবাদ করতে করতে যাই। পূরো শহর প্রদক্ষিণ শেষে ১৫ মাইল পথ অতিক্রম করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিরে আসি। সারাদেশে আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সমন্বয় করে আমরা প্রতিদিন আন্দোলন করছি। ৩রা মার্চে কৃষিবিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বরে স্বাধীন বাংলার (মাঝখানে মানচিত্র ও উদিত লাল সূর্য খচিত) লাল-সবুজ পতাকা উড়ায়ে কুচ্কা আওয়াজে অংশগ্রহণ করি। তারপর, আমরা সচেতন ছাত্ররা প্রতিদিন ভোর ৬টায় সামরিক কায়দায় প্যারেড করি এবং লাঠি হাতে যুদ্ধের মহড়া দেই। স্বাধীন বাংলার পতাকা হাতে প্রতিটা মিছিলে আমি সর্বদা আগে থাকি।
৭। বংগবন্ধু ৭ই মার্চে স্বাধীনতা ও মুক্তির ঘোষণাসহ যথোপযোগী ভাষণ দেন। স্বাধীনতা ও মুক্তির ঘোষণাসহ বংগবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ সারা দুনিয়ায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ। এ ভাষণের উপরও নিন্দুকদের সমালোচনার অন্ত নেই। আমি বিশ্বাস করি, আক্কেল মান্দের জন্য এ ঘোষণাই কাফি অর্থাৎ স্বাধীনতা প্রত্যাশী জনতার জন্য স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা। কারন, ৬ দফা ছাড়া তিনি কিছুতেই ক্ষমতা নেবেন না; আর পাকিস্তান প্রশাসন – ইয়াহিয়া-ভুট্ট গং কিছুতেই ৬ দফা মেনে নেবেন না; তাই, বাস্তবে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে না। স্বাধীনতা ও মুক্তি যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়বে। আর অন্য যারা স্বাধীনতা পেতে চায় নাই, তারা বুঝেছিল তিনি তখনও স্বাধীনতার ঘোষণা দেন নাই; ঢাকায় ইয়াহিয়া-ভুট্টদের সাথে আশু আলোচনার নিমিত্তে তিনি (বংগবন্ধু) কেবলমাত্র চাপ সৃষ্টি করেন। শেষোক্ত ধারনাটা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বিশ্বকে বুঝানো সম্ভব হবে যে, পাকিস্তান ভাংগার জন্য বংগবন্ধু দায়ী নন; বরং ইয়াহিয়া-ভুট্ট গং দায়ী। তাই, দু’টো লক্ষ্যই অর্জনের জন্য এ ভাষণ যথোপযোগী ছিল, পরবর্তীতে যা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যাবে। আমরা অনিবার্য মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হই।
৮। ১৬ই মার্চে ঢাকায় ইয়া
চলবে।