
চট্টগ্রামের বিয়ের সংস্কৃতি অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ভিন্ন। তবে দুঃখজনকভাবে, এই ভিন্নতা অনেক ক্ষেত্রে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে কনের পরিবারে। যৌতুক এবং অযৌক্তিক আচার-অনুষ্ঠান চট্টগ্রামের বিয়েকে একটি অর্থনৈতিক দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। যুগের পর যুগ ধরে এই প্রথা বৈধতা পেয়ে আসছে এবং আজ তা ফ্যাশন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
যৌতুকের বৈধতার রূপ
চট্টগ্রামে যৌতুককে একধরনের অধিকার হিসেবে দেখা হয়। বিয়ের সময় কনের পরিবারকে শুধু অর্থ নয়, বরং অগণিত আনুষ্ঠানিকতার খরচও বহন করতে হয়।
খাবার পর্ব
বিয়ের সময় বরপক্ষের ৪০০ থেকে ১,০০০ অতিথিকে বিলাসবহুল খাবারের আয়োজন করতে হয়। চিংড়ি, গরু ও খাসির মাংস, রূপচাঁদা মাছ, পোলাও, চিকেন টিক্কাসহ আইটেমের তালিকা যেন শেষ হওয়ার নয়। সামান্য খাবারের স্বাদ বা আয়োজনে ত্রুটি হলে তা নিয়ে বরপক্ষের অভিযোগ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
অনুষ্ঠানের বহর
বিয়ের পূর্বে আকদ আয়োজনের জন্য আলাদা খরচ, আর বিয়ের পর নবদম্পতির বাড়িতে যাওয়া বা বরযাত্রার জন্য বিশাল বহর নিয়ে আনুষ্ঠানিকতা—এগুলো কনের পরিবারের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
ঋতুভিত্তিক উপহার
গ্রীষ্মে মৌসুমি ফল, রমজানে ইফতারি, ঈদে শপিং, কুরবানির ঈদে গরুসহ রান্নার সব উপকরণ—সবই কনের পরিবারের দায়িত্ব। এমনকি সন্তান জন্মালে বাচ্চার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও দিতে হয়।
ফার্নিচার ও বিলাসপণ্যের চাপ
বিয়ের সময় কনের পরিবারকে উন্নত মানের ফার্নিচার, ফ্রিজ, টিভি, গ্যাসের চুলাসহ বিভিন্ন বিলাসপণ্য সরবরাহ করতে হয়। এগুলো কনের পরিবারের জন্য চরম অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে।
ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের অভাব
যৌতুক ও অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতা চট্টগ্রামের সমাজকে একপ্রকার বন্দী করে রেখেছে। অথচ ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সামাজিক সচেতনতার অভাবে এই অপসংস্কৃতি থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
সমাধানের পথ
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ।
1. সচেতনতা বৃদ্ধি: ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে যৌতুকের বিরুদ্ধে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা।
2. আইন প্রয়োগ: যৌতুকবিরোধী আইন বাস্তবায়নে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।
3. উদাহরণ সৃষ্টি: যৌতুকবিহীন বিয়ে সমাজে প্রচার করা।
4. শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধ: স্কুল, কলেজে নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করা।
অপসংস্কৃতিকে না বলুন
যুগের সাথে তাল মিলিয়ে বিশ্ব পরিবর্তিত হলেও, চট্টগ্রামের এই বিয়ের সংস্কৃতি বদলাতে পারেনি। আসুন, যৌতুক ও অযৌক্তিক আনুষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মানবিক দৃষ্টিকোণ জাগিয়ে তুলে এ অপসংস্কৃতি থেকে সমাজকে মুক্ত করি।
লেখা: শেখ মাহবুব আলম