
নিজস্ব প্রতিবেদক, রূপসা
খুলনার রূপসা উপজেলার গোয়াড়া গ্রামে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দখলের কারণে এক সাধারণ পরিবার দীর্ঘদিন ধরে চরম বিপর্যস্ত।
ভুক্তভোগী লস্কর পরিবারের অভিযোগ, উপজেলার ঘাটভোগ ইউনিয়নের গোয়াড়া গ্রামের মৃত নারায়ণ চন্দ্র লস্করের পরিবারের ৮টি ঘর, প্রায় ৭২ শতক জমি, একটি পানের বরজ, ৫–৭টি গরু এবং পারিবারিক ব্যবহারকৃত মালামাল জোরপূর্বক দখল করা হয়েছে। এর ফলে পরিবারটি বসতবাড়ি হারিয়ে মানুষের দুয়ারেতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
লস্কর পরিবারের সদস্যরা জানান, বড় ছেলে সন্তোষ লস্কর বর্তমানে বিভিন্ন মানুষের বাড়িতে অবস্থান করছেন, আর ছোট ছেলে রিপন লস্কর ভাড়া বাড়িতে বসবাস করছেন। দখলকৃত সম্পত্তি ফিরে পেতে তারা ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আজিদুল ইসলাম নুন্দুর কাছে বিচার চেয়ে আবেদন করেছিলেন। তবে গত ২০ সেপ্টেম্বর সামাজিকভাবে বসাবসির চেষ্টা করেও দখলকারীরা তা মানেনি।
ভুক্তভোগী সন্তোষ লস্কর (৭২) রূপসা থানায় লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেশী মৃত শুশেন বালা ও মৃত হরিপদ বালার ছেলে—সুকুমার বালা, অসীম বালা, মহিম বালা, রমেশ বালা, দীপক বালা, দেবব্রত বালা ও আরও ৫–৬ অজ্ঞাত ব্যক্তির সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ চলছিল। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ঘরে প্রবেশ করে পরিবারের সদস্যদের মারধর করেছে, ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করেছে এবং নগদ ২৭ হাজার টাকা ও আটটি গরু লুট করেছে।
সবচেয়ে নৃশংস হামলার শিকার হন ছোট ছেলে রিপন লস্কর। অভিযোগে বলা হয়েছে, তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে নাক, পিঠ, বুক, কোমর ও মাথায় লোহার রামদা ও গুপ্তি দিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হয়। স্থানীয়রা আহত রিপনকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকায় নেওয়া হয়।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গোয়াড়া গ্রামের মৃত অর্ধেন্দু মালাকারের মেজো ছেলে অমৃত মালাকার (৫৩) ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, “এভাবে কোনো পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করা উচিত নয়। তাদের বাড়ি ও জমি ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানাই।” এছাড়াও গোয়াড়া গ্রামের বাসিন্দা, ৫নং ওয়ার্ডের বিএনপি নেতা কৃপাসিন্দু (গুট্টে) মালাকার (৭৫), ইউনিয়ন জামাতের সভাপতি (আমীর) ডোবা গ্রামের বিজয় মজুমদার (৭০), উত্তম মালাকার (৪৫), মহলী পাড়ার পরিমল মহলী (৭৫) এবং অনিন্দ্য মালাকার (৩৫) এ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন।
অন্যদিকে গোয়াড়া গ্রামের বাসিন্দা অরুণ মালাকার (৭৫) জানান, “উক্ত ৭২ শতক জমি সন্তোষ লস্কর আমাদের কাছ থেকে কিনে ছিলেন। তবে কেন বালা পরিবার তা দখল করেছে, তা আমার জানা নেই। বর্তমান মূল মালিক সন্তোষ লস্কররা।” নারায়ণ চন্দ্র লস্করের পরিবার বাংলা ১৩৬০ সাল থেকে গোয়াড়া গ্রামে বসবাস করছে। পরিবারটি দীর্ঘদিন শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করছিল। হঠাৎ দখল, হামলা ও বিভিন্ন মিথ্যা মামলার কারণে তাদের জীবন চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে।
সন্তোষ লস্কর বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন শান্তিপূর্ণভাবে বসতভিটায় জীবন যাপন করছিলাম। হঠাৎ প্রভাবশালী ডোবা গ্রামের চরপাড়া এলাকার মৃত শুশেন বালা ও মৃত হরিপদ বালার ছেলেরা আমাদের সব সম্পদ দখল করে নিল। ছোট ভাই রিপনের ওপর হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে। প্রশাসন যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেয়, আমরা ন্যায়বিচার পাব না।” ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী, দখলদাররা এখনও সামাজিকভাবে বসার বা সমাধানের জন্য রাজি হয়নি। ফলে পরিবার পুনরায় অন্ধকারে পতিত হয়েছে।
রূপসা থানার অফিসার ইনচার্জ জানান, “অভিযোগটি আমরা পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” স্থানীয়রা এবং মানবাধিকার কর্মীরা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ ও লস্কর পরিবারের জমি ও সম্পত্তি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।