
নিজস্ব প্রতিবেদক
নড়াইল, কুষ্টিয়া ও খুলনার ইতিহাসে নওশের আলী লস্করের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি ১ জুলাই ১৯৩৮ সালে নড়াইল জেলার নড়াগাতী থানার নড়াগাতী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নওশের আলীর পিতা বাবন আলী লস্কর ছিলেন তৎকালীন সময়ে বৃটিশ সরকারে পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত একজন সম্মানিত কর্মকর্তা, যিনি সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও নিষ্ঠার জন্য এলাকায় বিশেষ সুনাম অর্জন করেছিলেন। নওশের আলী লস্কর দি পাটনা একাডেমি স্কুলের ছাত্র ছিলেন।
২৯ মে ১৯৬০ সালে তিনি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় কুষ্টিয়া জেলায় কর্মরত অবস্থায় পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে তাঁর বাম পায়ের হাঁটুর নিচে গুলিবিদ্ধ হন। আহত অবস্থাতেও তিনি গ্রামে পৌঁছানোর জন্য কখনও গরুর গাড়ী, কখনও নৌকা, কখনও জনগণের তৈরি স্ট্রেচার ব্যবহার করেন। পরবর্তীতে স্থানীয় পল্লি চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে আবার মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকায় ফিরে আসেন।
নওশের আলী লস্কর উল্লেখযোগ্যভাবে তিনটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন—কালিয়া, খুলনার তেরখাদা ও বর্তমান বাগেরহাট জেলার মোল্লাহাট—যেখানে তিনি পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করেন। দুঃখজনক হলেও তিনি মুক্তিযোদ্ধা সনদ পাননি; অথচ যাদেরকে তিনি সাহায্য করেছিলেন, তারা সকলেই সনদপ্রাপ্ত।
মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি কুষ্টিয়া জেলায় পুলিশ অফিসার হিসেবে পুনরায় যোগদান করেন। সহকারী পুলিশ পরিদর্শক (এসআই) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি পটুয়াখালীর পাথরঘাটা থানা সহ বিভিন্ন থানায় অফিসার ইনচার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন সময়ে এজাহার, সিডি, পিডি, চার্সিট ও ফাইনাল সমস্তই ইংরেজিতে লিখতে হতো।
নওশের আলীর ছেলে ও সাবেক পুলিশ সদস্য লস্কর ফিরোজ আহমেদ বলেন, “আমার বাবা ও দাদার জীবন আমাদের জন্য প্রেরণার উৎস। দাদা বাবন আলী লস্কর ছিলেন নিঃস্বার্থ, সততার অনন্য উদাহরণ। তিনি শুধু পুলিশ বাহিনীতে দক্ষ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তা ছিলেন না, বরং আমাদের এলাকার মানুষদের সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের জন্য যিনি সবসময় দায়িত্ব পালন করেছেন। দাদা এলাকার সব শিশু ও তরুণদের শিক্ষায় উৎসাহ দিতেন এবং যেকোনো সামাজিক সমস্যা সমাধানে তিনি সর্বদা অবদান রাখতেন।
আমার বাবা নওশের আলী লস্কর ছিলেন এক সাহসী ও নিঃস্বার্থ মানুষ। ১৯৭১ সালে তিনি পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে আহত হলেও থেমে থাকেননি। তিনি নিজ জীবন বিপন্ন করে গ্রামে ফিরে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যুদ্ধ করেছেন। তিনটি উল্লেখযোগ্য যুদ্ধে—কালিয়া, তেরখাদা ও মোল্লাহাট—তিনি সাফল্যের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছেন। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে পুলিশ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি দুর্নীতিমুক্ত ও আদর্শবান পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
আমাদের পরিবারের জন্য এটা গর্বের বিষয় যে, দাদা ও বাবা দু’জনেই দেশের জন্য নিজের জীবন বাজি রেখেছেন। তাদের ন্যায়পরায়ণতা, সততা এবং সাহসিকতা আমাদের জন্য চিরকাল প্রেরণার উৎস। আমি চাই তাদের অবদান যেন নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছায় এবং তারা দেশপ্রেম ও সাহসের শিক্ষা গ্রহণ করে। আমরা সন্তান হিসেবে গর্বিত যে, আমাদের পরিবারে এমন ত্যাগী ও দেশভক্ত মানুষ ছিলেন।”
নওশের আলী লস্কর ৩০ জুন ১৯৯২ সালে খুলনা জেলা থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ১৭ অক্টোবর ১৯৯৯ সালে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তাঁর সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের গল্প আজও নড়াইল, কুষ্টিয়া ও খুলনার মানুষের মনে জীবন্ত।
পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীরা সকলের কাছে দোয়া ও শ্রদ্ধা কামনা করেছেন যাতে নওশের আলী লস্করের আত্মা শান্তিতে থাকেন এবং তাঁর জীবন ও ত্যাগ দেশের জন্য অনুপ্রেরণার চিরন্তন উদাহরণ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকে।