
নিজস্ব প্রতিবেদক
নড়াইলের নড়াগাতী থানার ডুমুরিয়া গ্রামে চুরির মিথ্যা অভিযোগে দুই কিশোরকে হাত বেঁধে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ উঠেছে বাঐসোনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চুন্নু শেখ ও ঐ এলাকার কিছু লোকজনের বিরুদ্ধে। গুরুতর আহত অবস্থায় ওই দুই কিশোরকে প্রথমে গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়; পরে চিকিৎসকের পরামর্শে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় ওঠে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় নড়াগাতী থানার যোগানিয়া গ্রামের ইঞ্জিল গাজির বাড়িতে চুরির অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর উজ্জ্বল শেখের ছেলে আজিম শেখকে ৬৯ হাজার টাকাসহ হাতে–নাতে ধরা হয়। পরে আজিম শেখ নিজের নিরাপত্তার জন্য টাকাগুলো ফেরত দিয়ে প্রতিবেশী নিয়াজ ও ইমাম তার সহযোগি ছিল বলে উল্লেখ করে। এর পরই শুরু হয় এই দুই কিশোর—মো. নিয়াজ শেখ (১৪) ও মো. ইমাম শিকদার (১৪)—এর ওপর নির্যাতন।
ইমামের নানির ভাষ্য অনুযায়ী, ইঞ্জিল গাজি, তাঁর ভাই তারিকুল গাজি, ছেলে সালমান গাজি, আশিক শেখ (ওরফে ছোট চেয়ারম্যান), বক্কার সর্দার, কিস্মত শেখ, আতিক শেখ, রাজিব, আকবর সহ আরও কয়েকজন ওই নির্যাতনে অংশ নেন। প্রথমে দুই কিশোরকে তাঁদের নিজ নিজ বাড়ি থেকে ধরে এনে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান চুন্নু শেখের বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে নির্মমভাবে তাদের প্রহার করা হয়। এরপরও তারা ‘চুরির কথা’ স্বীকার না করায় যোগানিয়া বাজারসংলগ্ন চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত অফিসে নিয়ে পুনরায় মারধর করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে তারা জঘন্য একটা কাজ করেছে। অথচ প্রকৃত চোর আজিম শেখকে কোনো শারীরিক নির্যাতন করা হয়নি। নির্যাতিত দুই কিশোরের শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে—ইমাম শিকদারের মুখ ও গলায় ক্ষত, তার হাতের আঙুলের অবস্থা খুবই খারাপ আর নিয়াজ শেখের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফোলা ও ক্ষতের দাগ দেখা গেছে।
আহত ইমাম শিকদারের মা বলেন, “আমার ছেলেকে চোরের অপবাদ দিয়ে ধরে নিয়ে গেছে চুন্নু শেখের লোকজন। ধরে নিয়ে বেধড়ক মারধর করেছে। এখন সে ঢাকায় চিকিৎসাধীন। আমার ছেলে নির্দোষ। আমি চাই, যারা এ কাজ করেছে তাদের বিচার হোক।” ইমামের নানি বলেন, “ওদের লোকজন আমার নাতিকে বাড়ি থেকে টেনে নিয়ে গেছে। আমি অনেক কেঁদেছি, চেয়ারম্যানের পায়ে ধরেছি, আশিকের পায়ে ধরেছি—কেউ শোনেনি। চুন্নুর বাড়িতে আর পরে তার যোগানিয়ার অফিসে হাত বেঁধে ওদের মেরেছে; হাতের আঙুল ভেঙে দিয়েছে, বুকের ওপর পা দিয়ে চেপে রেখেছে, মুখে গলায় লাঠি ঢুকিয়েছে। এখন আমার নাতি হাসপাতালে, ওর অবস্থা খুবই খারাপ। আমি এর পূর্ণ বিচার চাই।”
অন্য আহত কিশোর নিয়াজ শেখের পিতা নাজমুল শেখ বলেন, “আমি ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় আছি। গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতাল থেকে তাকে ঢাকায় চিকিৎসার জন্য আনা হয়েছে। ডাক্তার বলেছেন, ওর শরীরে মারধরের চিহ্ন সর্বত্র। চিকিৎসা শেষে আমি আইনের আশ্রয় নেব। আমার ছেলে সম্পূর্ণ নির্দোষ।” এ বিষয়ে ইঞ্জিল গাজীর সঙ্গে তাঁর বাড়িতে চুরির অভিযোগ নিয়ে কথা বললে তিনি দাবি করেন, “আমার দুই লক্ষ টাকা চুরি হয়েছে, চোর আমার ঘরে সিধ কেটে ঢুকেছে।” তবে তাঁর বক্তব্যে বেশ কিছু গড়মিল রয়েছে। ইঞ্জিলের বাড়ি ওয়ালঘেরা হওয়ায় সিধ কি ভাবে কাটল জানতে চাইলে তিনি বলেন চোর রান্নাঘরের ডোয়ার মাটি কেটে বড় ঘরে প্রবেশ করেছে।
বাঐসোনা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চুন্নু শেখের কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “চুরির অভিযোগে কয়েকজনকে স্থানীয়রা ধরে আমার বাড়িতে এনেছিল। মারধরের ঘটনা ঘটেছে—এটি সত্য—তবে আমি কাউকে মারিনি। ভিডিওতে যাকে মারধর করতে দেখা যাচ্ছে, তিনি আশিক; ওই কিশোররা আশিকের আত্মীয়। তারা ছোট হওয়ায় আমি সরাসরি পুলিশে দেওয়াকে ঠিক মনে করিনি। আমি আহতদের চিকিৎসার খরচ বহন করছি। কিছু মহল ঘটনাটিকে বিকৃতভাবে প্রচার করছে। আশা করি, গণমাধ্যম সঠিক তথ্য প্রকাশ করবে।”
তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও ইমামের নানি দাবি করেছেন, ঘটনাটি চেয়ারম্যানের সামনেই ঘটেছে এবং তিনি তা থামানোর কোনো উদ্যোগ নেননি। স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, “যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের, সেখানে একজন জনপ্রতিনিধির উপস্থিতিতে দুই কিশোরকে এভাবে নির্যাতন করা কীভাবে সম্ভব? ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের সামনেই এমন অমানবিক আচরণ আইনের শাসনের পরিপন্থী ও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।”
মানবাধিকার কর্মীরা বলেন, “চুরির অভিযোগ থাকলেও তদন্ত ও বিচার করার দায়িত্ব আদালতের—কোনো জনপ্রতিনিধির নয়। একজন নির্বাচিত চেয়ারম্যানের সামনেই কিশোরদের হাত বেঁধে মারধর করা শুধু বেআইনি নয়, এটি সমাজে ন্যায়বিচারের ধারণাকে ভীষণভাবে দুর্বল করে।”
নড়াগাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিকুর রহমান বলেন, “ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হবার কথা শুনছি। এখনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” স্থানীয়রা বলছেন, “একজন নির্বাচিত চেয়ারম্যান যদি বিচারক বা পুলিশ হয়ে নিজেই দণ্ড দেন, তবে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার কোথায় থাকবে?” তাঁরা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।