
“আমি জিয়া বলছি”
অ্যাড. এম. মাফতুন আহমেদ
জিয়াউর রহমান—একজন কিংবদন্তী রাষ্ট্রনায়ক। স্বাধীনতার মহান ঘোষক; বীর মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধের আগুনে পোড়া খাঁটি সোনা। খাঁটি দেশপ্রেমিক। জাতির অগ্রগতির পথিক। তিনি গড়তে চেয়েছিলেন প্রকৃত অর্থে সোনার বাংলা—স্বনির্ভর, উৎপাদনমুখী, স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত একটি নতুন বাংলাদেশ।
রাত নেই, দিন নেই—একজন রাষ্ট্রনায়ক টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, পাটুরিয়া থেকে শিবসা—নদী-বেষ্টিত এই জনপদের মানুষকে সেদিন জাগিয়ে তুলেছিলেন। আত্মনির্ভরশীল একটি জাতি হিসেবে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন তিনি।
দুর্ভাগ্য! তাঁর শাসনামলে একের পর এক ষড়যন্ত্র। বারবার অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান। প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং তাদের বশংবদরা চায়নি বাংলাদেশ এই তল্লাটে জেগে উঠুক। তারা চায়নি স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে বিশ্ব দরবারে পতাকা ওড়াক। সেই লক্ষ্যে জিইয়ে রাখা হয়েছিল অভ্যন্তরীণ একের পর এক সংকট।
ঘটতে থাকে সদ্য স্বাধীন এই বাংলাদেশে নানা হত্যাযজ্ঞ। সেনাবাহিনীর ভেতরেও শুরু হয় চরম বিশৃঙ্খলা। ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর জেলখানায় নিহত হন জাতীয় চার নেতা। এর আগের দিন, অর্থাৎ ৩ নভেম্বর, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ ও ৪৬ পদাতিক ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শাফায়েত জামিলের নেতৃত্বে ঘটে আরেকটি সেনা অভ্যুত্থান। এই অভ্যুত্থানে সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে গৃহবন্দী করা হয়।
এটা সত্য, ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে পাল্টে দিতে ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। কয়েক দিনের জন্য সরকারবিহীন হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। জনগণ নিমজ্জিত হয় চরম হতাশা ও আতঙ্কে। ফিরে আসে একদলীয় শাসনের দুঃসময়; ফিরে আসে রুশ-ভারত অক্ষশক্তির তাঁবেদারির যুগ; ফিরে আসে সংবাদপত্রের শৃঙ্খলিত হওয়ার দিনগুলো। জনগণ তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
তাদের পরম আস্থার উৎস সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান তখন অভ্যুত্থানকারীদের হাতে বন্দি। যিনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরু হলে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে হতবিহ্বল জাতির প্রাণে প্রতিরোধের শিখা প্রজ্বলিত করেছিলেন—সেই মানুষটিকে যারা বন্দি কিংবা হত্যা করতে পারে, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও অস্তিত্বের বন্ধু হতে পারে না।
এমন এক শঙ্কা ও নৈরাশ্যের দুর্যোগে ৬ নভেম্বর মধ্যরাতের পর বিপ্লবী সৈনিকদের কামানের গোলার গর্জন কুচক্রীদের সব চক্রান্ত ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দেয়। কুচক্রীরা পালানোর পথ পায়নি। সুবেহ সাদেকের সূর্যালোকে ঢাকার রাজপথে দেখা দেয় এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। ট্রাকে ট্রাকে সৈনিকরা আকাশের দিকে গুলিবর্ষণ করে বিজয়ের আনন্দে ফেটে পড়ে। সৈনিক ও জনগণ একত্রে মিছিল করে। সেনা ট্যাঙ্কে ফুলের মালা পরিয়ে জনগণ সিপাহী বিপ্লবকে অভিনন্দিত করে। রেডিওতে আবার ভেসে আসে জিয়ার কণ্ঠস্বর—“আমি জিয়া বলছি।”
জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে; বুকের ওপর থেকে নেমে যায় জগদ্দল পাথর।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশে সংঘটিত হয় সিপাহী-জনতার মহাবিপ্লব। বলা যায়, এই বিপ্লব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অটুট রেখেছিল। জাতিকে ইস্পাতকঠিন দীপ্ত শপথে আগামীর বাংলাদেশ গঠনের পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। দ্বিধাহীনচিত্তে বলতে হয়, স্বাধীনতা দিবসসহ যে ক’টি দিবস আমাদের জাতীয় জীবনে গুরুত্বের দাবি রাখে—৭ নভেম্বর তাদের মধ্যে অনন্য মর্যাদার আসনে আসীন।
নানা মুনির নানা মত। অনেকে বলেন, কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে জিয়া সেদিন মুক্ত হয়েছিলেন। আসলে ইতিহাস তা বলে না।
সিপাহী-জনতার বিপ্লবে রয়েছে দুটি দিক—
একটি হলো কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার অফিসারবিহীন সেনাবাহিনী গঠনের প্রচেষ্টা এবং সেই লক্ষ্যে বিপুলসংখ্যক সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার পরিকল্পনা।
অন্যটি হলো, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিক ও জুনিয়র অফিসারদের মাধ্যমে বন্দি সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বভার প্রদান, সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে সেনাবাহিনী ও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।
কর্নেল (অব.) তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার জন্য সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান ঘটাতে একজন জনপ্রিয় মুখের প্রয়োজন ছিল। মুক্তিযোদ্ধা হলেও অবসরপ্রাপ্ত হওয়ায় কর্নেল তাহেরের পক্ষে সেই নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা, ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতার ঘোষণা, জেড ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদান—সব মিলিয়ে জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও যোগ্য অফিসার।
দেশবাসীর মাঝেও তাঁর ছিল অপরিসীম গ্রহণযোগ্যতা। কর্নেল তাহের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যদের বিভ্রান্ত করতে জিয়াউর রহমানের নাম ব্যবহার করেন এবং দাবি করেন—জেনারেল জিয়া তাদের সঙ্গে আছেন। যা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা। কর্নেল তাহেরের উদ্দেশ্য ছিল সেনা অভ্যুত্থানের পরপরই জিয়াকে মুক্ত করে তাঁর মুখ দিয়ে টেলিভিশনে ভাষণ প্রচার করানো, যাতে জনগণ অভ্যুত্থানের পক্ষে যায়। এরপর তাঁর জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে নিজেদের ১২ দফা দাবি বাস্তবায়নের পর জিয়াকে সরিয়ে দেওয়া।
ইতিহাসবিদদের মতে, জেনারেল জিয়া কোনোভাবেই কর্নেল তাহেরের এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না।
৭ নভেম্বরকে কেন্দ্র করে বলতে হয়—বিএনপি সৃষ্টি হয়েছিল জাতির এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। শহীদ জিয়ার আগমনও ঘটেছিল জাতির এক মহাক্রান্তিকালে। আজকের এই দিনের ইতিহাস যেন বিস্মৃতির পথে। যাদের ইতিহাস চর্চা করার কথা ছিল, তারা আজ নিস্পৃহ। অথচ ৭ নভেম্বরের ইতিহাস থেকে যদি আমরা শিক্ষা গ্রহণ না করি, তবে এই জাতির রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা আবারও বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা অস্বীকার করা যায় না।
—
লেখক: অ্যাড. এম. মাফতুন আহমেদ
(আইনজীবী, কলামিস্ট ও সম্পাদক, আজাদবার্তা)