
নিজস্ব প্রতিবেদক
অপহরণ মামলার তদন্তের সূত্র ধরে খুলনার বটিয়াঘাটায় উদ্ধার হওয়া মাথাবিহীন এক অজ্ঞাতনামা নারীর মৃতদেহের পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), খুলনা। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার এবং গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
পিবিআই সূত্র জানায়, খুলনা জেলার ডুমুরিয়া থানার সাজিয়ারা গ্রামের মজিদ ফকিরের ছেলে শামিম ফকির (৩০) তাঁর মা সালেহা বেগম নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় একই গ্রামের মো. লালন গাজীর বিরুদ্ধে আদালতে একটি অপহরণ মামলা করেন। আদালতের নির্দেশে পিবিআই খুলনার এসআই (নিঃ) রেজোয়ান মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করেন।
তদন্তকালে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় জানা যায়, সালেহা বেগম দীর্ঘদিন পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানী থানার চাড়াখালী এলাকায় অবস্থান করছিলেন। তবে ১৯ আগস্ট ২০২৫ সন্ধ্যার পর থেকে তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে অনুসন্ধানে জানা যায়, সালেহা বেগম ও মো. লালন গাজী স্বামী–স্ত্রী পরিচয়ে একই এলাকার জেসমিন বেগমের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। সর্বশেষ ওই দিন সন্ধ্যায় তাঁরা খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা থানার গজালিয়া গ্রামে যাওয়ার কথা বলে একসঙ্গে বাসা থেকে বের হন।
এদিকে, ২০ আগস্ট ২০২৫ বিকেল সাড়ে চারটার দিকে বটিয়াঘাটা থানার পুলিশ সুরখালী ইউনিয়নের সুখদাড়া গ্রামে ঝপঝপিয়া নদী থেকে মাথাবিহীন এক নারীর মৃতদেহ উদ্ধার করে। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় পুলিশ মৃতদেহের সুরতহাল তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায় এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে। এ ঘটনায় বটিয়াঘাটা থানায় একটি হত্যা মামলা (মামলা নম্বর-০৯/২০২৫, ধারা ৩০২/২০১/৩৪) দায়ের করা হয়। পরে মৃতদেহটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়।
পরে পিবিআই খুলনার ক্রাইমসিন টিমের সংগৃহীত স্থিরচিত্র অপহরণ মামলার বাদী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের দেখানো হলে তাঁরা মৃতদেহের পরিধেয় বস্ত্র ও শারীরিক গঠনের মাধ্যমে সেটি সালেহা বেগমের বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করেন। এরপর হত্যা মামলাটির তদন্তভারও পিবিআই গ্রহণ করে।
তদন্তে দেখা যায়, মৃতদেহ উদ্ধারের পর থেকেই অপহরণ মামলার আসামি মো. লালন গাজী পলাতক ছিলেন। পিবিআই প্রধান মো. মোস্তফা কামাল (অ্যাডিশনাল আইজিপি)–এর তত্ত্বাবধান ও দিকনির্দেশনায় এবং পিবিআই খুলনা জেলা ইউনিটের ইনচার্জ পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন (পিপিএম-সেবা)–এর নেতৃত্বে একটি দল খুলনা, সাতক্ষীরা, পিরোজপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায়।
দীর্ঘ ৪০ দিনের অনুসন্ধান ও নজরদারির পর গত ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ রাত পৌনে নয়টার দিকে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হালুয়ারঘাট বাজারসংলগ্ন খেয়াঘাট এলাকা থেকে মো. লালন গাজীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে আসামি স্বীকার করেন, সালেহা বেগম আগে সৌদি আরবে প্রবাসী শ্রমিক ছিলেন। ২০২৩ সালে দেশে ফেরার পর তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে আসামি ভিকটিমের ব্যাংক হিসাব থেকে প্রায় ১৪ লাখ টাকা তুলে নেন। টাকা ফেরত ও বিয়ের দাবিতে চাপ দিলে আসামি হত্যার পরিকল্পনা করেন।
স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট ২০২৫ বিকেলে সালেহা বেগমকে খুলনা নিয়ে যাওয়ার কথা বলে বটিয়াঘাটার একটি খেয়াঘাট এলাকায় নিয়ে যান এবং সহযোগীদের সহায়তায় তাঁকে হত্যা করে মরদেহের মাথা বিচ্ছিন্ন করে ঝপঝপিয়া নদীতে ফেলে দেন।
পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার পর আসামির দেখানো মতে ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ বটিয়াঘাটার গজালিয়া গ্রামে তাঁর মামাতো ভাইয়ের বাড়ির রান্নাঘর ও উঠানের মাটির নিচ থেকে সালেহা বেগমের ব্যবহৃত পোশাক ও অন্যান্য মালামাল উদ্ধার করা হয়।
পিবিআই জানায়, গ্রেপ্তার আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
NGS/MMH