
নিজস্ব প্রতিবেদক
বর্তমান সময়ে পুলিশের ভূমিকা ও তার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নিয়ে প্রশ্ন ও দ্বিধা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী পুলিশের পরিচয় ও অবস্থান বদলানোর ধারণাই এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। এক সময়ে যখন ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের হাতে পুলিশকে নির্যাতিত বলা হতো, তখন তাকে ‘ভালো’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো; আবার পরিস্থিতি বদলালে একই পুলিশকে বিভিন্ন রাজনৈতিক লেবেলে চিহ্নিত করে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। এই দ্বিমুখী মানদণ্ড রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর নিরপেক্ষতা ও দক্ষতার ওপর মানুষের আস্থাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
আইনের শাসন কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে না। পুলিশ রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহিনী, যারা জনগণের জীবন, সম্পদ ও আইনের শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত। কিন্তু রাজনৈতিক চাপ, পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ ও অনিয়মের অভিযোগ বা ব্যাখ্যা যদি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণের ভিত্তিতে করা হয়, তাহলে সেটি পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলোর সক্ষমতা ও সততার ওপর নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পুলিশি ব্যবহারের ওপর নানা সমালোচনা ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। জনগণ অনেকসময় মনে করেন পুলিশ রাজনৈতিক চাপ, নির্দেশনা বা স্বার্থের বাইরে থেকে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে পারছে না। অপরদিকে, রাজনৈতিক উত্তেজনা বা সমাবেশ-প্রতিবাদে পুলিশের পদক্ষেপকে অনৈতিক বা অপর্যাপ্ত বলে আখ্যায়িত করা হয়, যা পরিস্থিতিকে বিপজ্জনকভাবে উত্তেজিত করে তোলে।
একই সময়, সাংবাদিকদে্র ওপর হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সংবাদ সংগ্রহ ও সত্য প্রকাশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেকে বাধার মুখে পড়েছেন; মাঝে মাঝে সহিংস আচরণ বা হুমকির সম্মুখেও দাঁড়াতে হয়েছে। গণমাধ্যম কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে সংবাদ পরিবেশ ক্ষুণ্ন হয় এবং জনগণের জানার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো তথ্যের মুক্ত প্রবাহ এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা; সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণ মানে সেই মৌলিক অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা।
আইনের শাসন, পেশাদার পুলিশিং এবং গণমাধ্যমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের অন্যতম বৃহৎ দাবি। পুলিশকে রাজনৈতিক লেবেল ও চাপ থেকে মুক্ত রেখে পেশাদার, নিরপেক্ষ ও মানবিক দিকগুলোতে প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য একটি স্বচ্ছ নিয়োগ, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, যা শুধুমাত্র পুলিশের দক্ষতা বৃদ্ধিই নয়, বরং জনগণের মধ্যে আস্থা পুনঃস্থাপনেও ভূমিকা রাখবে।
একইভাবে, গণমাধ্যম কর্মীদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর পরিকল্পনা ও বাস্তব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সাংবাদিকেরা যখন নির্ভয়ে তথ্য সংগ্রহ ও সংবাদ প্রকাশ করতে পারে, তখনই জনগণ উন্নত ও সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারে; এবং মাত্র সেই সময় গণতন্ত্র পূর্ণমাত্রায় বাস্তবায়িত হয়।
রাজনীতির চাপ, অপপ্রচার ও পক্ষপাতদুষ্ট মানদণ্ডের বাইরে থেকে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজ মিলিতভাবে কাজ করলে আইনের শাসন, পেশাদার পুলিশিং ও গণমাধ্যমের নিরাপত্তার গ্যারান্টি সম্ভব। রাষ্ট্রীয় সংস্থা ও গণমাধ্যমকে রক্ষা করাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী, সমতাভিত্তিক ও দায়বদ্ধ সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দেবে।