
সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালুআল্লাহ তায়ালাকে চেনা ও জানা দ্বীনের মূলনীতি। স্বয়ং আল্লাহ তার বান্দাদের কাছে নিজের নাম ও গুণাবলির পরিচয় দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে হালাল-হারাম সম্পর্কিত আয়াতের তুলনায় আল্লাহর নাম, গুণাবলি ও কর্মগুলো সম্পর্কিত আয়াতের সংখ্যা অনেক বেশি। আল্লাহর অন্যতম গুণবাচক নাম হচ্ছে আল হামিদ অর্থ সর্বময় প্রশংসার অধিকারী। এ নামে এমন কিছু গুণ ও প্রশংসার উপকরণ রয়েছে যা তার প্রশংসনীয় হওয়ার দাবি রাখে, এমনকি যদি তিনি ছাড়া অন্য কেউ তার প্রশংসা না করে তবুও। তিনি কোরআনে এ নামের সঙ্গে পরাক্রমশালী, অভিভাবক, মহিমান্বিত, অভাবমুক্ত ও প্রজ্ঞাময় বিশেষণ যুক্ত করেছেন। আল্লাহর প্রশংসা বলতে তার প্রতি ভালোবাসা, ভক্তির সঙ্গে তার পরিপূর্ণ গুণাবলি ও সম্মানজনক বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ করার মাধ্যমে তার গুণকীর্তন করা এবং তার সৌন্দর্য সম্পর্কে সংবাদ দেওয়াকে বোঝায়। কাজেই আল্লাহর স্বীয় সত্তারপরিপূর্ণতা ও সৌন্দর্য তার জন্য এবং তার কর্ম, সৃষ্টির ওপর দয়া ও ইহসানের জন্য তার প্রশংসা করতেই হবে।
স্বয়ং আল্লাহ নিজের প্রশংসা করেছেন এবং তিনি স্বীয় সত্তার প্রশংসা ও মহিমা প্রকাশ করাকে পছন্দ করেন। আল্লাহ কর্র্তৃক স্বীয় সত্তার প্রশংসা শ্রেষ্ঠ ও সর্বোচ্চ প্রশংসা; তিনি কেমন প্রশংসার যোগ্য তা প্রকৃতপক্ষে তিনি ছাড়া আর কেউই পূর্ণভাবে জানে না। কাজেই সৃষ্টির কেউ তার গুণকীর্তন আয়ত্ত ও সম্পন্ন করতে পারবে না। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহর চেয়ে প্রশংসা-প্রীতি অন্য কারও নেই; তাই তিনি নিজেই নিজের প্রশংসা করেছেন।’ -সহিহ্ বোখারি ও মুসলিম
ইমাম নববি (রহ.) বলেন, বস্তুত এটা বান্দার কল্যাণের জন্য। কেননা তারা আল্লাহর প্রশংসা করে সওয়াব পায়, ফলে মানুষ এ থেকে উপকৃত হয়। আর আল্লাহ সৃষ্টিজগতের কারও মুখাপেক্ষী নন; তাদের প্রশংসায় তার কোনো উপকার হয় না এবং প্রশংসা না করায় তার কোনো ক্ষতিও হয় না। স্বীয় প্রশংসা ও মহিমা উল্লেখ করে আল্লাহ কোরআনের পাঁচটি সুরা আরম্ভ করেছেন। সেগুলোতে তিনি সংবাদ দিয়েছেন, তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, কিতাব নাজিল করেছেন, রাসুল প্রেরণ করেছেন, তিনিই সৃষ্টিকে জীবন ও মৃত্যু দেন এবং কোরআনের শুরুতে সর্বময় স্বীয় প্রভুত্বের অধিকারী তিনিই মর্মে ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি সৃষ্টিকুলের প্রতিপালক।’ -সুরা ফাতেহা : ১
আরশ বহনকারী ফেরেশতারা নিরলসভাবে আল্লাহর প্রশংসায় ব্যস্ত। সব ফেরেশতা আল্লাহর প্রশংসা করে। সব নবীই আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি করেছেন। মহান আল্লাহ নবী মুহাম্মদ (সা.) কে তার প্রশংসা করতে নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘বলুন, সব প্রশংসা আল্লাহর এবং শান্তি তার মনোনীত বান্দাদের প্রতি।’ -সুরা আন নামল : ৫৯
আল্লাহ তার বান্দাদেরও নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা তার প্রশংসা করে। জান্নাতের ওয়াদাপ্রাপ্ত মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, তারা আল্লাহর প্রশংসাকারী বান্দা। এমনকি বজ্রধ্বনিও আল্লাহর সপ্রশংস পবিত্রতা ঘোষণা করে এবং ফেরেশতারাও তাই করে তার ভয়ে। প্রত্যেক কাল ও স্থানে তার প্রশংসা ও গুণকীর্তন বিদ্যমান। আসমান, জমিন ও এ দুয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু আল্লাহর প্রশংসায় পরিপূর্ণ; সৃষ্টিজগতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর প্রশংসা করে ও পবিত্রতা বর্ণনা করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘সাত আসমান ও জমিন এবং এগুলোর অন্তর্বর্তী সবকিছু তারই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং এমন কিছু নেই যা তার সপ্রশংস পবিত্রতা বর্ণনা করে না; কিন্তু তাদের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা তোমরা বুঝতে পারো না।’ -সুরা বনি ইসরাইল : ৪৪
আল্লাহর প্রশংসা একটি গুরুত্বপূর্ণ জিকির, যা আল্লাহ পছন্দ করেন। তাই বান্দা রাতদিন যেসব কথা বলে, তার মধ্যে আল্লাহর প্রশংসামূলক জিকির থাকা অধিক হকদার ও জরুরি। রাতদিনের কোনো সময় যেন এমন জিকিরবিহীন না কাটে। দ্বীনের সব বিষয় তওহিদ (আল্লাহর একত্ববাদ) ও হামদ (প্রশংসা) কে কেন্দ্র করে পরিচালিত। ইবাদত-বন্দেগির মধ্যে, বিশেষ করে নামাজকে প্রশংসা করে শুরু করা বান্দার জন্য আল্লাহ বৈধ করেছেন। হজ সম্পাদনের সময়ও হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) অধিকাংশ ক্ষেত্রে আল্লাহর গুণকীর্তন করতেন। হজের ‘তালবিয়া’তেও আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা দিয়ে বলা হয়, নিশ্চয় যাবতীয় প্রশংসা, নেয়ামত ও রাজত্ব একমাত্র আপনারই।’ সহিহ্ বোখারি জুমার খুতবা, ঈদের খুতবা এবং ইসলামি মাহফিলসহ আরও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের শুরুতে আল্লাহর মহিমা প্রকাশ করে শুরু করা হয়। আল্লাহর প্রশংসা ও তার গুণকীর্তন বিবেক-বুদ্ধিকে স্পর্শ করে। জিকিরের মজলিসসমূহ (ইসলামি আলোচনা সভা, নসিহত প্রদানমূলক বৈঠক, কোরআন-হাদিসে দারস ইত্যাদি) যেখানে আল্লাহর গুণকীর্তন করা হয়, সেখানে ফেরেশতারা উপস্থিত হন। তারপর তারা আল্লাহকে সংবাদ দেন, তারা (মানুষ) তোমার (আল্লাহর) তাসবিহ, তাকবির, তাহলিল ও তাহমিদ পাঠ করছে এবং দোয়া করছে। ফলে এ কারণে তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হয়। – সহিহ্ বোখারি।
যে দোয়ার শুরুতে আল্লাহর প্রশংসা করা হয়, তা কবুল হওয়ার অধিক উপযোগী। নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন দোয়া করে, তখন সে যেন আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন দিয়ে শুরু করে।’ -সুনানে তিরমিজি
আল্লাহর প্রশংসা যেমন বান্দার ইবাদতসমূহের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তেমনি তা বান্দার প্রত্যেক অবস্থার সঙ্গী। যে ব্যক্তি হামদ পাঠে নিজের জিহ্বাকে একবার নাড়াবে, এতে সে প্রতিবার তাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহ) পাঠের বিনিময়ে ধন-সম্পদ সদকা করার সমান সওয়াব পাবে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি তাহমিদ তথা আলহামদুলিল্লাহ বলা একটি সদকা।’- সহিহ্ মুসলিম
যে ব্যক্তি সর্বদা নিজেকে হামদ পাঠে ব্যস্ত রাখে সে সবার চেয়ে অগ্রগামী। ‘আলহামদুলিল্লাহ’ মিজানের পরিমাপকে সওয়াবে পরিপূর্ণ করে দেয়, আর ‘সুবহানাল্লাহ ওয়ালহামদুলিল্লাহ’ আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী স্থানকে পরিপূর্ণ করে দেয়। যেমনভাবে প্রত্যেক ভালো কাজ হামদ ও সানা দিয়ে সূচনা হয়, তেমনি তার সমাপ্তিতেও হামদ রয়েছে। ‘যদি কেউ এমন কোনো বৈঠকে বসে যেখানে নানারকম অহেতুক কথাবার্তা হয়, তাহলে বৈঠক ত্যাগের পূর্বে যদি বলে, হে আল্লাহ! আমি আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করছি, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি ছাড়া সত্য কোনো মাবুদ নেই, আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি ও তওবা করছি। তাহলে উক্ত বৈঠকে যা হয়েছে তা ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ -সুনানে তিরমিজি।