
সম্পাদকীয়
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার নতুন প্রজন্মের শিক্ষা, জ্ঞান ও দক্ষতার ওপর। অথচ আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে এখন নানা প্রশ্ন সামনে আসছে। শিক্ষার্থীরা কি ধীরে ধীরে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে? কেন শ্রেণিকক্ষের পাঠ, বইয়ের জ্ঞান ও সৃজনশীল চর্চার চেয়ে মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর অনলাইন বিনোদন তাদের বেশি আকৃষ্ট করছে? এর দায় কি কেবল শিক্ষার্থীদের, নাকি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থারও রয়েছে?
সম্প্রতি প্রকাশিত ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল এসব প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। গত ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত ফলাফলে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জন। গত বছর পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছিল ৬৯ হাজার ৯৭ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ পয়েন্ট। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রকাশিত ফলাফলসংক্রান্ত তথ্যে এ চিত্র উঠে এসেছে।
নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার সর্বোচ্চ ৬১ দশমিক ৮০ শতাংশ। বিপরীতে বরিশাল বোর্ডে পাসের হার সর্বনিম্ন ৪৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। যশোর বোর্ডে পাসের হার ৪৪ দশমিক ৯২, রাজশাহীতে ৪৫ দশমিক ০৬, দিনাজপুরে ৪৫ দশমিক ৯৮, কুমিল্লায় ৪৮ দশমিক ০৪, সিলেটে ৫০ দশমিক ৯০, ময়মনসিংহে ৫১ দশমিক ৪৪ এবং চট্টগ্রামে ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬১ দশমিক ০৭ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, এ বছর ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। গত বছর এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ২০২টি। অন্যদিকে শতভাগ পাস করেছে মাত্র ১৩৯টি প্রতিষ্ঠান। এসব পরিসংখ্যান শুধু পরীক্ষার ফলাফলের অবনতিই নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান, ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
তবে ফলাফল খারাপ হলেই শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। পরীক্ষার ফলাফল নির্ভর করে শিক্ষার্থীর প্রস্তুতি, পাঠদানের মান, মূল্যায়ন পদ্ধতি, পারিবারিক পরিবেশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা এবং আরও অনেক বিষয়ের ওপর। তাই ফলাফল খারাপ হওয়ার দায় এককভাবে শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা নিরপেক্ষভাবে খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা হলো, অনেক ক্ষেত্রে শেখার চেয়ে পরীক্ষায় ভালো ফল করার প্রতিযোগিতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের বিষয় বুঝে শেখার পরিবর্তে মুখস্থনির্ভর হয়ে পড়ছে। শ্রেণিকক্ষে প্রশ্ন করা, নতুন কিছু জানার চেষ্টা, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করা কিংবা বাস্তব সমস্যার সমাধান শেখার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত। ফলে শিক্ষার প্রতি স্বাভাবিক আগ্রহ তৈরি হওয়ার বদলে পড়াশোনা অনেকের কাছে পরীক্ষায় পাস করার চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারও শিক্ষার্থীদের মনোযোগে প্রভাব ফেলছে। স্মার্টফোন, ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, অনলাইন গেম ও নানা ধরনের বিনোদনে কিশোর-তরুণদের বড় একটি অংশ দীর্ঘ সময় ব্যয় করছে। প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে জ্ঞান অর্জনের বড় মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু এর যথাযথ ব্যবহার না জানলে সেটিই পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। শুধু মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার, সময় ব্যবস্থাপনা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখাতে হবে।
পরিবারের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক অভিভাবক সন্তানের ফলাফল ও জিপিএ নিয়ে এতটাই উদ্বিগ্ন থাকেন যে সন্তানের প্রকৃত আগ্রহ, মানসিক অবস্থা ও শেখার সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করেন না। অন্যের সন্তানের সঙ্গে তুলনা, অতিরিক্ত প্রত্যাশা এবং ভালো ফলের জন্য অব্যাহত চাপ অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে হতাশা তৈরি করে। অথচ প্রতিটি শিশুর মেধা, শেখার গতি ও আগ্রহ এক নয়। কাউকে চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা সরকারি কর্মকর্তা হতেই হবে—এমন ধারণা চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। সন্তানের যোগ্যতা ও আগ্রহ অনুযায়ী তাকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
শিক্ষকদের দায়িত্বও কেবল পাঠ্যসূচি শেষ করা কিংবা পরীক্ষার আগে সাজেশন দেওয়া নয়। একজন শিক্ষকের কাজ শিক্ষার্থীর মধ্যে জানার আগ্রহ তৈরি করা, দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং শেখার পরিবেশ গড়ে তোলা। শ্রেণিকক্ষকে এমন জায়গায় পরিণত করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থী নির্ভয়ে প্রশ্ন করতে পারে, নিজের মত প্রকাশ করতে পারে এবং ভুল থেকে শিখতে পারে। শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি, মানসম্মত পাঠদান ও শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের বিষয়েও কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।
এবারের ফলাফলে বিষয়ভিত্তিক পার্থক্যও ভাবনার বিষয়। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের হিসাবে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৭৩ দশমিক ১২ শতাংশ, ব্যবসায় শিক্ষায় ৫০ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং মানবিক বিভাগে ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ। এ পার্থক্য শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক প্রস্তুতি ও পাঠদানের মান নিয়ে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। বিশেষ করে ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা কোথায়, তা চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্ক। বছরের পর বছর পড়াশোনা শেষ করেও যখন একজন তরুণ নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ পান না, তখন শিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ ও প্রত্যাশায় হতাশা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। শিক্ষাকে শুধু সনদ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে না দেখে বাস্তব জীবনের দক্ষতা অর্জনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, ভাষাগত দক্ষতা, উদ্যোক্তা হওয়ার প্রশিক্ষণ এবং কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো জরুরি। উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাকেও সামাজিক মর্যাদা দিতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিও নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে একাধিক বছর ধরে শিক্ষার্থীরা অকৃতকার্য হলে শুধু ফলাফল প্রকাশ করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। সেখানে পাঠদান কেমন হচ্ছে, শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন কি না, শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করা হচ্ছে কি না এবং পরিচালনা কমিটি যথাযথ দায়িত্ব পালন করছে কি না—এসব বিষয় তদন্ত ও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে শুধু ফলাফলের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও উন্নয়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
সব শিক্ষার্থী একই পথে এগোবে না, সবার সাফল্যের সংজ্ঞাও এক নয়। কেউ উচ্চশিক্ষায় যাবে, কেউ কারিগরি দক্ষতা অর্জন করবে, কেউ ব্যবসা করবে, কেউ কৃষি বা শিল্প খাতে কাজ করবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রত্যেকের জন্য মানসম্মত ও উপযোগী শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা। শিক্ষার্থীদের মেধা ও আগ্রহ অনুযায়ী বিকাশের পথ তৈরি করতে না পারলে শুধু পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য পরিমাপ করা যাবে না।
২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এ ফলাফলকে শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার পরিবর্তে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা শনাক্ত ও সংশোধনের সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে পাঠদান পদ্ধতিতে পরিবর্তন, মানসিক সহায়তা, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।
আমরা এমন প্রজন্ম চাই, যারা শুধু পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর পাবে না; বরং জ্ঞান অর্জন করবে, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করবে, প্রশ্ন করতে শিখবে এবং দেশ গঠনে ভূমিকা রাখবে। মনে রাখতে হবে, কিশোর-তরুণেরা পড়াশোনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে শুধু তাদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো সমাজ ও রাষ্ট্র। তাই এখনই প্রশ্ন তোলার সময়—শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় আগ্রহ হারাচ্ছে কেন, আর তাদের আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে আমরা কী করছি?