
একজন মানুষ যখন পেশাগত দায়িত্ব, পারিবারিক বন্ধন এবং ব্যক্তিগত নীতিবোধের মধ্যে সুনির্দিষ্ট ভারসাম্য রক্ষা করেন—তখন তিনি কেবল একজন পেশাজীবী নন, হয়ে ওঠেন সমাজের আদর্শ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রাক্তন কর্পোরাল দ্বীন মোহাম্মদের জীবন ঠিক তেমনি এক গল্প—নীরব অথচ গৌরবোজ্জ্বল, কঠোর কিন্তু ভালোবাসায় ভরা।
তাদের দাম্পত্য জীবনের ১৮তম বার্ষিকী। এই দিনটি শুধু স্মৃতির নয়, দায়িত্ব, আস্থা এবং ভালোবাসার পুনঃসংকল্পেরও দিন। সেনাবাহিনীতে দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের পর তিনি এখন কুমিল্লায় বসবাস করছেন পরিবারের সঙ্গে, গড়ে তুলেছেন সৎ ও সংগ্রামী জীবনের এক নতুন অধ্যায়।
সেনাসদস্য হিসেবে কর্পোরাল দ্বীন মোহাম্মদ ছিলেন ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন দক্ষ ও বিশ্বস্ত সদস্য। মাঠে ছিলেন চৌকস গোলকিপার, আর ইউনিটে পরিচিত ছিলেন শৃঙ্খলাবান ও বিনয়ী সৈনিক হিসেবে। তাঁর সহকর্মীরা এখনও শ্রদ্ধাভরে বলেন—“যার হাতে দায়িত্ব থাকত, সে জানত ঠিক সময়ে, ঠিকভাবে তা শেষ হবে।”
তিনি বলেন- “আমার স্ত্রী শুধু আমার জীবনের সঙ্গী নন, তিনি আমার শক্তি, সাহস এবং শান্তির উৎস। জীবনের প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে তিনি আমার পাশে থেকেছেন, আমাকে উৎসাহ দিয়েছেন এবং সংসারের সব দায়িত্ব অক্লান্তভাবে সামলেছেন। তাঁর ধৈর্য, ভালোবাসা ও অবিচল বিশ্বাস আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। ১৮ বছর ধরে একসঙ্গে পথ চলতে পেরে আমি নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে করি। এই যাত্রায় তার অবদান অবিস্মরণীয় এবং আমি ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ, যে আমাকে এমন একজন জীবনসঙ্গী দিয়েছেন।”
তাঁর সহধর্মিণী বলেন,“আমি কখনো ভাবিনি একজন সেনাসদস্যের স্ত্রী হওয়া এমন এক ধৈর্যের পাঠশালা হবে। বহু রাত কেটেছে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে, ঈদের সকালে ছেলে-মেয়েদের চোখে বাবাকে না পাওয়ার অভিমান দেখে চুপ থেকেছি। কিন্তু সব কষ্ট ঢেকে দিত তাঁর একটি হাসি, একটি ফোন কল, অথবা বাসায় ফিরে সন্তানের কপালে দেওয়া তাঁর ভালোবাসার স্পর্শ। আমি জানি, তিনি শুধু আমার স্বামী নন, তিনি আমাদের পরিবারের ভিত। সংসারের চালিকাশক্তি তিনি, কিন্তু তার চেয়েও বড় কিছু—তিনি একজন আদর্শ মানুষ।
এই ১৮ বছরে আমি শিখেছি, ভালোবাসা মানে একসাথে সিনেমা দেখা নয়, শপিং নয়—ভালোবাসা মানে, সময় না থাকলেও দায়িত্বে থাকা, দূরে থেকেও পাশে থাকা। আজ আমি গর্ব করে বলি, আমি একজন সেনাসদস্যের স্ত্রী, এবং একজন সৎ, পরিশ্রমী, আল্লাহভীরু মানুষের জীবনসঙ্গী।” সন্তানদের প্রতি ও দায়িত্ববোধ ছিল অবিচল। সৎ পথে চলা, পরিশ্রম করা, এবং বিনয়ী থাকা—এই তিন নীতিতে তিনি নিজেও চলেন, সন্তানদেরও তাই শেখান।
অবসর গ্রহণের পর তিনি ছোট একটি ব্যবসা শুরু করেছেন, পাশাপাশি প্রতিদিন ব্যায়াম করেন, তরুণদের খেলাধুলায় উৎসাহ দেন। স্থানীয় মসজিদে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও নিয়মিত অংশগ্রহণ করেন। তাঁর মতে, “ভালো মানুষ হতে হলে আগে নিজের প্রতি দায়িত্ববান হতে হয়—তারপর পরিবার, সমাজ, দেশ।”
প্রতিবেশীরা বলেন, “দ্বীন ভাইয়ের জীবনে কোনো অহংকার নেই। উনি যেভাবে সেনাবাহিনীতে ছিলেন ঠিক তেমনই মানুষ এখনো। সত্যিকারের ‘নির্ভরতা’ বলতে যদি কিছু থাকে—তাহলে সেটা উনার মত মানুষদের জন্যই বলা যায়।”
জীবনের প্রতিটি দিন যদি হয় সততার অনুশীলন, পারিবারিক ভালোবাসার চর্চা আর দায়িত্বের দৃঢ়তায় পূর্ণ—তবে সে জীবন নিঃসন্দেহে উদাহরণ হয়ে থাকে। কর্পোরাল দ্বীন মোহাম্মদের এই ১৮ বছরের দাম্পত্য ও মানবিক যাত্রা সকল পরিবারের জন্য এক পাঠ—যেখানে ভালোবাসা কেবল আবেগ নয়, বরং প্রতিদিনের দায়িত্ব ও শ্রদ্ধার ভাষা।