
নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা:
খুলনা জেলা পরিষদের অফিস সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটর এমডি আসলাম হোসেনকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্ক ও অভিযোগ চলমান। সহকর্মী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিবাদ, অনৈতিক আর্থিক লেনদেন, রাজনৈতিক কটুক্তি, অফিসের নথিপত্র বাইরে প্রকাশ এবং সেবা প্রার্থীদের হয়রানিসহ নানা অভিযোগ তার বিরুদ্ধে রয়েছে।
এমডি আসলাম হোসেনের নিয়োগ শুরু হয় ২০০৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি, খুলনা জেলা পরিষদে নিম্নমান সহকারী-কাম-মুদ্রাক্ষরিক/কম্পিউটার অপারেটর পদে। পরবর্তীতে বিভাগীয় কমিশনারের তদন্তে দেখা যায়, তিনি বাছাই পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করার পরও প্রথম স্থান দেখানো হয়েছিল। স্থানীয় সরকার বিভাগের ২০০৭ সালের ৩ ডিসেম্বরের স্মারক অনুযায়ী তার নিয়োগ বাতিল করা হয় এবং প্রকৃত প্রথম স্থান অধিকারী মোঃ গফফার হোসেনকে নিয়োগের আদেশ দেওয়া হয়।
এরপর খুলনা জেলা জজ আদালতে (দেঃ ১৭৬/১৮) এমডি আসলাম মামলা দায়ের করেন। মামলায় তার পক্ষে রায় আসলে জেলা পরিষদ আপীল দায়ের করে (দেঃ আপীল ১৬/২০০৯), যা নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখে। হাইকোর্টে আপীল না করায়, ২০০৯ সালের ২৬ জুলাই প্রাক্তন সচিব মোঃ নুরুল হক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকাকালীন এমডি আসলামকে স্বপদে যোগদানের অনুমতি দেওয়া হয়।
কর্মজীবন শুরু হওয়ার পর থেকেই বিতর্ক শুরু হয়। ২০০৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তিনি তিনজন ঠিকাদারের সঙ্গে মারামারি করেন। ১৬ নভেম্বর খুলনা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল হান্নান বিশ্বাস তাকে জরুরি ভিত্তিতে অন্যত্র বদলির জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। অভিযোগ ছিল, তিনি অফিসের নথি খুলে তথ্য সংগ্রহ এবং তা বাইরে প্রকাশ করেন, কর্মকর্তাদের আতঙ্কে রাখেন, সেবা প্রার্থীদের হয়রানি ও অনৈতিকভাবে অর্থ গ্রহণ করেন। এছাড়া বিএনপির বিরুদ্ধে কটুক্তি করার অভিযোগও প্রমাণিত হয়।
তার চাকরি সংক্রান্ত বিতর্কের পর ২০১২ সালে তাকে যশোর জেলা পরিষদে বদলি করা হয়। এরপর চুয়াডাঙ্গা ও বাগেরহাট জেলা পরিষদে যোগদান না করতে পারায় তাকে রাজশাহীতে বদলি করা হয়। কিছুদিন সেখানে থাকার পর ঝিনাইদহ হয়ে ২০২৪ সালে পুনরায় খুলনায় যোগদান করেন।
খুলনায় যোগদানের পর তিনি আবারও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। চলতি বছরের মে মাসে চাকরির প্রলোভনে ধর্ষণের অভিযোগে খুলনা সদর থানায় মামলা দায়ের হয় এক তরুণীর দ্বারা। ফেব্রুয়ারীতে তিনি খুলনা মহানগর বিএনপির সিনিয়র নেতা শাহজী কামাল টিপুর সামনে রাজনীতি নিয়ে কটুক্তি করেন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করা হয়। জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা তাছলিমা আক্তার তদন্তে নিশ্চিত করেন, এমডি আসলাম অফিস চলাকালীন সময়ে রাজনীতি নিয়ে কটুক্তি করেছেন, যা স্থানীয় সরকার (জেলা পরিষদ) কর্মকর্তা ও কর্মচারী চাকুরী বিধিমালা, ১৯৯০ আইন ৩৭(২) (ক)-এর পরিপন্থী।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এমডি আসলাম হোসেন বলেন, “সবই পরিকল্পিত; এসবের কোনো সত্যতা নেই। চাকরির শুরুতে কিছু সমস্যা হয়েছিল, পরে মামলার মাধ্যমে চাকরি ফিরে পাই। আমাকে বারবার বদলি করা হয়েছে, তবে প্রতিবাদি হওয়ায় আমার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ আনা হচ্ছে।”
স্থানীয়দের মতে, সরকারি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তারা যদি শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেন, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
খুলনা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সেলিমা রেজা বলেন, “নিয়োগের বিষয়টি অনেক পুরাতন, আমার জানা ছিল না। তবে রাজনৈতিক কটুক্তির অভিযোগে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”