
শেখ মাহতাব হোসেন ডুমুরিয়া (খুলনা)
ডুমুরিয়ার গ্রামবাংলা এখন হলুদ সরিষার ফুলে ছেয়ে গেছে। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে ফুটে থাকা সরিষা ফুল যেন প্রকৃতির উৎসব। এই হলুদ প্রান্তরের মাঝেই সারি সারি করে বসানো হয়েছে শত শত মৌবাক্স। সরিষা ক্ষেতে মৌমাছি ছেড়ে মধু সংগ্রহ করছেন মৌচাষিরা। এতে একদিকে যেমন মৌচাষিরা লাভবান হচ্ছেন, অন্যদিকে মৌমাছির পরাগায়ণের কারণে বাড়ছে সরিষার ফলনও।
ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে ২৪৬টি মৌবাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করছেন সাতক্ষীরার মেসার্স মাহিম মৌ খামারের মৌচাষি মিজানুর রহমান। তিনি প্রায় ১৪ দিন ধরে সরিষা ক্ষেতে মৌবাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ ও বাজারজাত করছেন।
মৌবাক্স পরিচর্যায় নিয়োজিত শ্রমিক মো. ইসলাম, কবির ও হাসান জানান, সাধারণত ১০ দিন পরপর মৌবাক্স থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি বাক্স থেকে গড়ে প্রায় ৪ কেজি মধু পাওয়া যায়। এ পর্যন্ত ২৪৬টি মৌবাক্স থেকে প্রায় ৩৫ মণ মধু সংগ্রহ করা হয়েছে।
এক যুগের বেশি সময় ধরে মৌচাষ ও মধু সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত মিজানুর রহমান বলেন, “গত বছর পাঁচ মাসে ২৪৬টি মৌবাক্স থেকে প্রায় ১২০ মণ মধু সংগ্রহ করেছিলাম। এ বছরও একই পরিমাণ মধু পাওয়ার আশা করছি।” তিনি জানান, প্রতি কেজি মধু ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। এই মধু দেশের এসিআই ও এপি এবং ভারতের ডাবর কোম্পানির কাছে সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি স্থানীয় বাজারেও খুচরা বিক্রি হয়।
মৌচাষিরা জানান, সাধারণত অগ্রহায়ণ ও পৌষ মাসে সরিষা ফুল থেকে সবচেয়ে বেশি মধু সংগ্রহ করা যায়। প্রতিটি মৌবাক্সে ছয় থেকে আটটি ফ্রেম থাকে এবং একটি বাক্সে একটি রানী মৌমাছির সঙ্গে থাকে ৫০ হাজারের বেশি মৌমাছি। মৌমাছিগুলো চার কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত গিয়ে মধু সংগ্রহ করতে পারে।
মৌচাষিরা বছরে সাধারণত পাঁচ মাস দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে মধু সংগ্রহ করেন। বাকি সাত মাস মৌমাছিদের খাবার দিয়ে পালন করা হয়। শীত মৌসুমে খুলনার ডুমুরিয়াসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরিষা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়। শীত শেষে মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও ফরিদপুরে ধনে ও কালিজিরা ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করা হয়। এরপর ঈশ্বরদী, নাটোর, রাজশাহী ও দিনাজপুরে লিচুর ফুল থেকে মধু আহরণ করা হয়। সাধারণত চৈত্র মাসে লিচু ফুলের মধু সংগ্রহ শেষ হয়।
কৃষি বিভাগ জানায়, গত বছর খুলনা জেলায় ৪১ হাজার ১৬৫ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছিল। সে সময় ৩৪ জন মৌচাষি ৫ হাজার ৬৪৩টি মৌবাক্স থেকে প্রায় ২৭ টন মধু সংগ্রহ করেন। চলতি মৌসুমে জেলায় ৪১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। এ বছর ৪৫ জন মৌচাষি মোট ৭ হাজার ২৮৭টি মৌবাক্স স্থাপন করেছেন।
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “মৌবাক্সের মাধ্যমে মধু সংগ্রহে মৌচাষি ও সরিষাচাষি—উভয়ই লাভবান হন। মৌমাছির পরাগায়ণের ফলে ফসলের উৎপাদন বাড়ে। গত বছরের তুলনায় এ বছর সরিষার আবাদ বেশি হয়েছে। ফলে মধু সংগ্রহও বাড়বে বলে আশা করছি। তবে মধু সংগ্রহের কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় না।”
NGS/MMH