
হাফিজা খানম, স্টাফ রিপোর্টার
খুলনার তেরোখাদা উপজেলার মোকামপুর ইউনিয়নের নদীপাড়ে শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) সকাল থেকে শুরু হয় উৎসব। ঢোলের শব্দ, বাঁশির তালে তালে নদীর বুক চিরে এগিয়ে চলে সাজানো নৌকা। বৈঠার ছন্দে ছন্দে ওঠে উল্লাসধ্বনি—‘চলো চলো, এগিয়ে চলো’। শত শত দর্শক তখন দুই তীরে দাঁড়িয়ে করতালি দিচ্ছেন, কেউ বা স্লোগান তুলছেন প্রিয় দলের পক্ষে। এমন প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় মোকামপুর মধ্যপাড়া যুবসংঘের আয়োজনে দশম ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ ও সাঁতার প্রতিযোগিতা। দিনব্যাপী আয়োজনে মোকামপুর, তেরোখাদা, আজগড়া, ছাগলাদহসহ আশপাশের এলাকার মানুষ ভিড় জমায় নদীর পাড়ে। উৎসবকে কেন্দ্র করে আশপাশের গ্রামে চলে মেলা, বিক্রি হয় স্থানীয় পিঠা, খেলনা, বেলুন, পানীয় ও নানা মুখরোচক খাবার।
মোকামপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের আয়োজনে এ প্রতিযোগিতায় প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনা জেলা যুবদলের আহ্বায়ক ইবাদুল হক রুবায়েত। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম মোস্তফা তুহিন এবং তেরোখাদা উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মোল্যা হুমায়ুন কবির।
অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন তেরোখাদা উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাব্বির আহমেদ টগর। সভাপতিত্ব করেন ইউনিয়ন ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি মুন্সী মাহবুব হাসান সজীব। সঞ্চালনা করেন উপজেলা ছাত্রদল নেতা মো. ফোরকান হোসেন এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন ছাত্রদল নেতা মো. আব্দুল মজিদ মোল্যা।
প্রধান অতিথি ইবাদুল হক রুবায়েত বলেন, “বাংলার নৌকা বাইচ শুধু একটি ঐতিহ্য নয়, এটি গ্রামীণ ঐক্য ও সাহসিকতার প্রতীক। আজকের এই আয়োজন প্রমাণ করে—তরুণ প্রজন্ম এখনো আমাদের সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের মূল্যবোধ ধরে রেখেছে। খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডই পারে যুব সমাজকে মাদক ও সামাজিক অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই, এই প্রজন্ম ঐতিহ্যের ধারক হয়ে উঠুক, পাশাপাশি সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিক। এমন উদ্যোগকে যুবদল ও ছাত্রদলের তরুণ নেতৃত্ব আরও এগিয়ে নেবে—এই প্রত্যাশা করি।”
উদ্বোধনী বক্তব্যে সাব্বির আহমেদ টগর বলেন, “নৌকা বাইচ শুধু ক্রীড়া নয়, এটি আমাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত এক গভীর ঐতিহ্য। তরুণদের এই আয়োজন দলবদ্ধতা, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব শেখায়। আমরা চাই, সমাজে প্রতিটি তরুণ হোক উদ্যমী, দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত।”
সভাপতির বক্তব্যে মুন্সী মাহবুব হাসান সজীব বলেন, “যুব সমাজের শক্তিই একটি জাতির আসল সম্পদ। তাদেরকে ক্রীড়াচর্চা ও সামাজিক কর্মে সম্পৃক্ত করতে পারলে সমাজে শান্তি, সৌহার্দ্য ও উন্নয়নের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আজকের আয়োজন সেই বার্তাই দিয়েছে।”
অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং বিপুল সংখ্যক দর্শক উপস্থিত ছিলেন। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা। শেষ বিকেলে সূর্য যখন ধীরে ধীরে পশ্চিমে হেলে পড়ে, তখনও নদীর তীরে মানুষের ভিড়। কেউ ফিরছেন হাতে পুরস্কার নিয়ে, কেউ বা মুখে হাসি নিয়ে। ঢেউয়ের ওপর নৌকার শেষ বৈঠা পড়তেই মোকামপুরের আকাশে বেজে ওঠে একটাই অনুভব—বাংলার ঐতিহ্য এখনো বেঁচে আছে, মানুষের হৃদয়ে, নদীর বুকে।