
নিজস্ব প্রতিবেদক
নড়াইলের নড়াগাতিতে রানী রাসমনির কাচারি বাড়ি: উপেক্ষিত ঐতিহ্য আজ ধ্বংসের মুখে দুশো বছরের ইতিহাস, ইংরেজ শাসনের নির্যাতনের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক ভবনটি।
নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার নড়াগাতিতে আঠারো শতকের গোড়ায় নির্মিত রানী রাসমনির কাচারি বাড়িটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। ২০০ বছরের পুরোনো এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি শুধু স্থাপত্য নয়, ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসন, নীল চাষের দুঃসহ ইতিহাস এবং জমিদারী প্রথার শাসনব্যবস্থার জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করে আসছে। তবে সরকারের অনীহা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং স্থানীয়ভাবে কোনো উদ্যোগ না থাকায় এটি আজ অবহেলা আর পরিত্যক্ততার চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
১৮১২ সালে এই কাচারি বাড়িটি নির্মাণ করেন তৎকালীন জমিদার রানী রাসমনি। যশোর জেলার অধীন মকিমপুর পরগনার শাসনকাজ পরিচালনার জন্য রানী রাসমনি কালিয়া উপজেলার নড়াগাতিকে কেন্দ্র করে ৪ একর ৪৯ শতক জমির ওপর নির্মাণ করেন এই কাচারি ভবনটি। লাল ইট ও চুন-সুরকির কারুকার্যে নির্মিত ভবনটির দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৮০ ফুট এবং প্রস্থ ৫৫ ফুট।
এই কাচারি বাড়ি থেকেই প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায়, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা হতো। বাড়িটির পাশেই ছিল একটি কারুকার্য খচিত মন্দির, যা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্র ছিল।
ইংরেজ শাসনের নির্যাতনের কেন্দ্র:
নড়াইলের পূর্বাঞ্চলে তৎকালীন সময়ে ইংরেজ নীলকরদের প্রভাবে ১২টির বেশি নীলকুঠি গড়ে ওঠে। এসব কুঠির মাধ্যমেই কৃষকদের জোর করে নীল চাষে বাধ্য করা হতো। আর এই কাচারি বাড়িটি হয়ে ওঠে জমিদার ও ইংরেজ বেনিয়াদের নির্যাতনের মিলিত ঘাঁটি।
রানীর নায়েব শশীভূষণ ছিলেন কুখ্যাত নির্যাতক। প্রজাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক কর আদায় ও নীলচাষে বাধ্য করানোর কাজে তার নামে বহু জনশ্রুতি রয়েছে। অবাধ্য প্রজাদের ধরে এনে এই কাচারি বাড়ির ভেতরেই নির্যাতন করা হতো। কেউ কেউ সেই নির্যাতনে প্রাণ হারান বলেও স্থানীয়রা জানান।
জনশ্রুতি অনুসারে, ইংরেজদের অত্যাচারে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের মধ্যে আছেন কালিয়া উপজেলার গাজীরহাট গ্রামের কালু খাঁ, বাঐসোনা গ্রামের মোল্যা তমিজউদ্দিন এবং মধুপুর গ্রামের রাঙ্গা মিয়া। এসব শহীদদের লাশ গুম করার কথাও প্রচলিত রয়েছে।
কাচারিকে ঘিরে প্রশাসনিক গঠন:
এই কাচারি বাড়িকে কেন্দ্র করেই ১৮১৫ সালে ইংরেজ সরকার ‘নড়াগাতি থানা’ প্রতিষ্ঠা করে, যা বর্তমানে কালিয়া উপজেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে বিবেচিত। এটি তৎকালীন সময়ে নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা এবং রাজস্ব আদায়ের কেন্দ্র ছিল।
আজকের অবস্থা: অযত্ন, চুরি আর দখলদারি:
একসময় জমিদারী শাসনের রাজকীয় কাচারি বাড়িটি এখন পরিণত হয়েছে গোয়ালঘর ও বৃষ্টির দিনে আশ্রয়স্থলে। বাড়িটির জানালা, দরজা ও মূল্যবান কাঠামো ইতিমধ্যে চুরি হয়ে গেছে। ভবনের পাশে থাকা মন্দিরটিও এখন ঝুঁকিপূর্ণ। পরিত্যক্ত ভবনটি এখন স্থানীয়দের ভাষায় “সরকারি মাল, দরিয়ায় ঢাল” নীতির শিকার।
সরকারি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবেও তালিকাভুক্ত এই ভবনের চারপাশের জমিও নানা প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংরক্ষণ ও দাবি:
স্থানীয় শিক্ষিত সমাজ, ইতিহাসপ্রেমী ও তরুণ প্রজন্ম রানী রাসমনির কাচারি বাড়িকে সংরক্ষণের জোর দাবি জানিয়েছেন। তারা চান, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মাধ্যমে কাচারি ভবনটি সংরক্ষণ করে একটি ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হোক, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিখতে পারে ব্রিটিশ শাসনের নিষ্ঠুরতা, নীল বিদ্রোহের ইতিহাস এবং জমিদারী প্রথার বাস্তবতা।
আপনার এলাকায় এমন ঐতিহাসিক নিদর্শন থাকলে তার তথ্য পাঠান [ naragatirsangbad@gmail.com ]–এ, আমরা তুলে ধরবো তার ইতিহাস।