
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও বিনোদনের ইতিহাসে সিনেমা হল একসময় ছিল গ্রামীণ ও শহুরে জীবনের অন্যতম আকর্ষণ। বিশেষ করে আশি-নব্বই দশকে পরিবার-পরিজন, বন্ধুবান্ধব কিংবা প্রতিবেশীরা মিলে সিনেমা দেখতে যেতেন হলে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পাল্টে গেছে মানুষের বিনোদনের ধারা। টেলিভিশন, স্যাটেলাইট চ্যানেল, ভিডিও সিডি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেটভিত্তিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মে ঝুঁকে পড়েছে দর্শক। ফলে দেশের নানা প্রান্তে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সিনেমা হল।
এই ধারাবাহিকতায় নড়াইল জেলায়ও শেষ অবলম্বন ভেঙে পড়ল। কালিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ‘আল্পনা’ সিনেমা হল এখন আর সিনেমা প্রদর্শনের জায়গা নয়, রূপ নিয়েছে তাবলিগ জামাতের মার্কাজ মসজিদে।
১৯৮৪ সালে যাত্রা, দুই দশক ধরে বন্ধ:
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৪ সালে ‘টাউন হল’ নামে ভবনটির উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক এম শাফায়াত আলী। পরবর্তীতে ভবনটি ‘আল্পনা’ সিনেমা হলে রূপ নেয়। আশপাশে দোকানপাট, হোটেল, খাবারের আড্ডা—সব মিলিয়ে একসময় জমজমাট হয়ে উঠেছিল এ স্থান। তবে নতুন প্রজন্ম সিনেমা হলে আগ্রহ হারানো, সিনেমার মানের অবনতি ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে প্রায় দুই দশক আগে বন্ধ হয়ে যায় হলটি। সেই থেকে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল এটি।
চারপাশে জঙ্গল গজিয়ে ওঠে, দোকানপাট উঠে যায়, লোকজনের আনাগোনা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। একসময় প্রাণবন্ত এ স্থান পরিণত হয় নির্জন ভবনে।
তাবলিগ জামাতের দাওয়াতি কাজে ব্যবহৃত:
সম্প্রতি তাবলিগ জামাতের আলমী শুরা-নেজামের পক্ষে মাওলানা শহিদুল সিনেমা হলটি ইজারা নেন। তিনি এটিকে ধর্মীয় কাজে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেন। গত বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘আল্পনা’ সিনেমা হল রূপ নেয় ‘তাবলিগী মার্কাজ মসজিদে’।
মো. রায়হান শেখ বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ! কালিয়া নড়াইলের আল্পনা সিনেমা হল এখন থেকে মারকাজ মসজিদ। যেখানে একসময় গুনাহর অন্ধকার ছিল, আজ সেখানে আল্লাহর জিকির-ফিকির, দ্বীনি দাওয়াতের কাজ চলবে। অন্ধকার বিদায় নেবে, জায়গা করে নেবে ঈমানের আলো।”
প্রশাসনের বক্তব্য:
কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাশেদুজ্জামান বলেন, “প্রায় ২০ বছর আগে আল্পনা সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যায়। এটি সরকারের ভেস্টেড প্রপার্টির আওতাভুক্ত। কেউ একজন সরকারের কাছ থেকে ইজারা নিয়ে তখন পরিচালনা করতেন বলে শুনেছি। বর্তমানে এটি ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।”
এছাড়া স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, একই এলাকায় সরকারের অর্থায়নে একটি আধুনিক মডেল মসজিদের নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। এতে নামাজ আদায় ও ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার সুব্যবস্থা থাকবে।
এলাকাবাসীর প্রতিক্রিয়া:
এলাকাবাসীরা জানিয়েছেন, সিনেমা হল যুগের অবসান হলেও এটি মসজিদে রূপান্তরিত হওয়ায় তাদের ভেতরে স্বস্তি ও সন্তুষ্টি কাজ করছে। দীর্ঘদিন ফাঁকা পড়ে থাকা একটি ভবন আজ ধর্মীয় চর্চার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হওয়ায় স্থানীয়রা খুশি। তাদের মতে, এ মসজিদে নিয়মিত নামাজ, ইসলামী শিক্ষা ও দাওয়াতি কার্যক্রমের মাধ্যমে এলাকার মানুষ ধর্মীয়ভাবে সচেতন হবে, তরুণ প্রজন্ম সঠিক পথে চলার অনুপ্রেরণা পাবে এবং পারিবারিক-সামাজিক পরিবেশ আরও উন্নত হবে। তারা বলেন, একসময় এই হলকে কেন্দ্র করে বিনোদন হতো, আজ একই স্থান ঈমান ও ধর্মীয় সংস্কৃতির আলোয় ভরে উঠছে—এটাই তাদের কাছে বড় প্রাপ্তি।
ইতিহাসে মিলিয়ে যাওয়া সিনেমা হল:
নড়াইল জেলায় একসময় তিনটি সিনেমা হল ছিল। সদর উপজেলায় ‘চিত্রাবাণী’, লোহাগড়ায় ‘সন্ধ্যা’ আর কালিয়ায় ‘আল্পনা’। সিনেমা প্রেমীদের পদচারণায় সরগরম ছিল সেসব হল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দর্শকের অভাব, ব্যবসায়িক ক্ষতি ও নতুন বিনোদন মাধ্যমের দখলে একে একে সবগুলোই বন্ধ হয়ে গেছে।
আজ নড়াইল জেলায় সিনেমা হল কেবলই ইতিহাস। তবে এলাকাবাসীর বিশ্বাস, অব্যবহৃত পড়ে থাকার চেয়ে ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় এ স্থান আবারও নতুনভাবে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।