
১৯৯৩ সালে আমি বাঐসোনা কামশিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এসএসসি ব্যাচের একজন শিক্ষার্থী ছিলাম। প্রতিটি সকাল শুরু হতো স্কুল মাঠে ভোরের নরম আলো আর পাঠের প্রস্তুতির সঙ্গে। বই-খাতা, বন্ধুদের হাসি-মজার মধ্য দিয়ে শ্রেণিকক্ষে পা দেওয়ার মুহূর্তগুলো আজও হৃদয়ে অম্লানভাবে বেঁচে আছে।
আজ, বিশ্ব শিক্ষক দিবসে, আমি ফিরে দেখি সেই দিনগুলো—যখন ক্লাসরুম ছিল আমার শেখার প্রথম অঙ্গন, আর শিক্ষকরা ছিলেন জীবনের প্রথম দিশারি। তাঁরা শুধু পাঠদান করতেন না; শিখাতেন দায়িত্ববোধ, নৈতিকতা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার পথ।
বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষক ছিলেন আলাদা ব্যক্তিত্বের, কিন্তু সকলের লক্ষ্য এক—আমাদের সঠিক পথে গড়ে তোলা। কেউ কঠোর শৃঙ্খলায় শিক্ষা দিতেন, কেউ হাসিমুখে উৎসাহ দিতেন, কেউ ব্যর্থতার মুহূর্তে বলতেন—“ভয় পেও না, চেষ্টা চালিয়ে যাও।” সেই কথাগুলো আজও আমার জীবনের শক্তি।
বাঐসোনা কামশিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় শুধুমাত্র একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না—এটি ছিল আমাদের গড়ে ওঠার কারিগর, আমাদের স্বপ্নের ক্ষেত। শ্রেণিকক্ষের পাঠ, মাঠের খেলা, শিক্ষকদের কোমল দৃষ্টি—সবই আজও জীবন্ত স্মৃতি। তাঁদের শিক্ষা আমাদের কেবল জ্ঞানই দেয়নি, চরিত্র ও মননে আলোকিত করেছে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস প্রতিবছর ৫ অক্টোবর পালিত হয়। ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেস্কো) এই দিনটিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণা করে—শিক্ষকদের আত্মত্যাগ ও অবদানকে শ্রদ্ধা জানাতে। এ বছরের প্রতিপাদ্য হলো—“শিক্ষকতাকে একটি সহযোগী পেশা হিসেবে পুনর্গঠন”—যা শিক্ষকদের সম্মিলিত দায়িত্ববোধ ও সমাজ গঠনের আহ্বান জানায়।
আজও আমাদের দেশের শিক্ষকরা সেই দায়িত্বের পূর্ণ উদাহরণ হয়ে চলেছেন—নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছেন আগামী প্রজন্মের আলোকিত ভবিষ্যতের জন্য। তাঁরা দিনের পর দিন শ্রেণিকক্ষে, গ্রামীণ ও শহরের বিভিন্ন স্থানে পাঠদান করছেন; কেবল নিজের জন্য নয়, সমগ্র জাতির জন্য।
আমাদের বাঐসোনা কামশিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার গর্ভ থেকেই আজ দেশের গর্বিত সন্তানরা বেরিয়ে এসেছে—বড় বড় কর্মকর্তা, ব্যাংকার, শিক্ষক, প্রফেসর, অধ্যাপক, সমাজসেবক এবং দেশ পরিচালনার কাজে অবদান রাখছে এমন অনেক মানুষ। অনেক প্রাক্তন ছাত্র আজ বিদেশেও দায়িত্ব পালন করছেন। এটি সম্ভব হয়েছে সেই শিক্ষকদের আন্তরিকতা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে, যারা নিজস্ব সাহস, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ দিয়ে আমাদের গড়ে তুলেছেন।
আজকের দিন শুধুই শিক্ষকদের স্মরণ নয়; এটি শিক্ষার শক্তিকে সম্মান জানানোর দিন। আমাদের বিদ্যালয়ের প্রতি ভালোবাসা, শিক্ষক ও ছাত্রদের আন্তরিক সম্পর্ক, একে অপরের প্রতি বিশ্বাস—এসবই আমাদের দেশের অগ্রযাত্রাকে শক্তিশালী করেছে।
আজকের শিক্ষক দিবসে আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন সকল প্রিয় শিক্ষক সুস্থ, দীর্ঘায়ু ও শান্তিতে থাকেন। যারা আমাদের ছেড়ে গেছেন, আল্লাহ তাদের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দিয়ে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন। এসএসসি ৯৩ ব্যাচের সকল ছাত্রদের পক্ষ থেকে আমরা সকল প্রিয় শিক্ষকদের প্রতি অন্তরের গভীর থেকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করছি। তাঁদের শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা আমাদের জীবনের অমোঘ প্রেরণা হয়ে থাকবে।
আজ যারা বর্তমান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, আমি দৃঢ় বিশ্বাস করি তাঁরা পুরনো শিক্ষকদের নীতিগুণ ও আদর্শ অনুসরণ করে বর্তমান ছাত্রদের এমনভাবে গড়ে তুলবেন, যাতে আগামী প্রজন্ম একদিন তাঁদেরকে শ্রদ্ধা ও প্রশংসায় স্মরণ করবে।
শিক্ষক দিবসে তাই একটিই আবেদন—শিক্ষকদের সম্মান দিন, তাঁদের অবদান মূল্যায়ন করুন, তাঁদের হাতে সমর্থন ও দায়িত্ব দিন—কারণ শিক্ষকরা কেবল পাঠদান করেন না, তাঁরা জাতি গড়ে তোলেন, মানুষ গড়ে তোলেন।
(লেখক: বাঐসোনা কামশিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র)