
শেখ মাহতাব হোসেন, ডুমুরিয়া (খুলনা)
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে পানিফল—স্থানীয়ভাবে পানি সিংড়া—চাষ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একসময় কেবল গ্রামীণ খাদ্য হিসেবে পরিচিত এই মৌসুমি জলজ ফল এখন জেলার সীমানা পেরিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে নিয়মিত যাচ্ছে। কম খরচ, কম পরিচর্যা এবং স্থিতিশীল বাজারদর—এই তিন কারণে চাষিরা দ্রুতই এই ফসলে ঝুঁকছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ডুমুরিয়ার খাল, বিল, নিম্নভূমি ও জলাশয়গুলোতে এখন বিস্তীর্ণ এলাকায় পানিফলের লতা ভাসছে। পানিতে ভাসমান লতায় ফল ধরে বলেই এর নাম পানিফল বা পানি সিংড়া। অনেক চাষি মাছের ঘেরে মিশ্রচাষ পদ্ধতিতে এটি উৎপাদন করেন, ফলে অতিরিক্ত কোনো শ্রম বা খরচ লাগে না। ফলটিতে প্রচুর পানি, খনিজ ও পুষ্টি উপাদান থাকায় বাজারে সারা মৌসুমেই এর চাহিদা স্থির থাকে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিপুল পতিত খালবিল ও জলাশয় ব্যবহারের মাধ্যমে পানিফল চাষে তারা ভালো আয় করছেন। প্রতি বছর চাষের পরিমাণ বাড়ায় স্থানীয় হাটবাজারে সরবরাহও বেড়েছে। এতে এলাকায় মৌসুমি কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে। ডুমুরিয়ার ডাকাতিয়া খাল এলাকায় এখন সারি–সারি সবুজ লতায় ভরা পানিফলের ক্ষেত দেখা যায়। কাঁচা ও সিদ্ধ—দুইভাবেই বাজারে বিক্রি হয় এই ফল, শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গায়ই এর ক্রেতা বাড়ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে জানা যায়, আষাঢ় থেকে ভাদ্র–আশ্বিন পর্যন্ত পানিফলের চারা রোপণ করা হয়। রোপণের দুই থেকে আড়াই মাস পর ফল সংগ্রহ শুরু হয়। একটি গাছ থেকে তিন থেকে চার দফায় ফল তোলা যায় এবং পৌষ মাস পর্যন্ত উৎপাদন অব্যাহত থাকে। পানিফলে বীজ না থাকায় মৌসুম শেষে পরিপক্ব ফল সংরক্ষণ করে পরের বছরের চারা তৈরি করা হয়। কৃষি বিভাগের ধারণা, আগামী বছর আরও বেশি জলাশয়ে এই ফসলের আবাদ ছড়াবে।
গুটুদিয়া ইউনিয়নের লতা গ্রামের কৃষক দীপঙ্কর মণ্ডল বলেন, “এ বছর সাড়ে সাত বিঘা জমিতে পানিফল চাষ করেছি। খরচ খুব কম, শ্রমও কম লাগে। আশা করছি, খরচের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ লাভ হবে।”
চুকনগর বাজারের ফল ব্যবসায়ী হযরত আলী মোল্লা জানান, “আশ্বিন থেকে পৌষ পর্যন্ত একটানা এই ফল বিক্রি করা যায়। প্রতিদিন এক মন মতো বিক্রি করি, এতে ৫০০–৬০০ টাকা লাভ থাকে।”
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. ইনসাদ ইবনে আমিন বলেন, “পানিফল খুবই সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ। ডুমুরিয়া থেকে পানিফল এবং এর চারা দেশের নানা জেলায় যাচ্ছে। আগামী বছর এই উপজেলায় চাষ আরও বাড়বে বলে আমরা আশাবাদী।” ডুমুরিয়ার জলাশয়ভিত্তিক কৃষি অর্থনীতিতে পানিফল এখন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে—এমনটাই মনে করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।