
শেখ মাহতাব হোসেন
বাংলাদেশের চিংড়ি শিল্প কেবল একটি অর্থনৈতিক খাত নয়, এটি আমাদের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস এবং দেশের ভাবমূর্তির প্রতীক। অথচ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের RASFF (Rapid Alert System for Food and Feed) সতর্কতা বার্তা আমাদের রপ্তানি বাজারের সামনে গুরুতর সংকট তৈরি করেছে। এই সতর্কতা এসেছে চিংড়িতে নিষিদ্ধ রাসায়নিক ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণে—যা শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতি নয়, জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় সুনামের জন্যও এক বড় হুমকি।
দেবহাটার পারুলিয়া বাজারে আহসানিয়া ফিশ ডিপো প্রাঙ্গণে আয়োজিত “গুড অ্যাকুয়াকালচার প্র্যাকটিস (GAP)” বিষয়ক সচেতনতা সভা এই প্রেক্ষাপটে এক ইতিবাচক উদ্যোগ। উপজেলা মৎস্য দপ্তর, মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তর (FIQC), এবং ইন্টারন্যাশনাল শ্রিম্প এক্সপোর্টারস লিমিটেডের যৌথ এই আয়োজন প্রমাণ করে যে সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও রপ্তানিকারকরা এখন বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিচ্ছেন।
সভায় বক্তারা যে বিষয়টি সবচেয়ে জোর দিয়ে বলেছেন তা হলো—“ম্যালাকাইট গ্রিনসহ নিষিদ্ধ রাসায়নিক ব্যবহারে শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance)”। এই বক্তব্য কেবল একটি প্রশাসনিক ঘোষণা নয়; এটি বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির ভবিষ্যৎ রক্ষার অঙ্গীকার। ম্যালাকাইট গ্রিন, নাইট্রোফিউরান, ক্লোরামফেনিকল, মেট্রোনিডাজল ও ক্রিস্টাল ভায়োলেটের মতো রাসায়নিক পদার্থগুলো মানবদেহে ক্যান্সার, লিভার ও কিডনি জটিলতা সৃষ্টি করে—ফলে এগুলোর ব্যবহার কেবল অনৈতিক নয়, অপরাধও বটে।
চিংড়ি শিল্পে দায়বদ্ধতা শুরু হতে হবে চাষি পর্যায় থেকেই। অনুমোদিত ইনপুট ব্যবহার, নিয়মিত পানি ও মাটির মান পরীক্ষা, ঘেরের তথ্য সংরক্ষণ ও ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করা—এসবই এখন সময়ের দাবি। অন্যদিকে ডিপো, আড়ত ও প্রসেসিং কারখানাগুলোকে HACCP নীতিমালা কঠোরভাবে মানতে হবে। অপরিষ্কার বরফ, দূষিত পানি, কিংবা যাচাইবিহীন উৎসের চিংড়ি ক্রয়—এসব এখন আর অবহেলার বিষয় নয়; বরং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিটি ভুলের মূল্য দিতে হয় পুরো দেশকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিরাপদ চিংড়ি উৎপাদন কেবল রপ্তানির জন্য নয়—এটি দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। বিদেশি ক্রেতা হারানো মানে শুধু রপ্তানি কমে যাওয়া নয়, বরং দেশের কৃষি অর্থনীতির এক বড় ধাক্কা। সরকারি পর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং, প্রশিক্ষণ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। একইসঙ্গে গণমাধ্যম, গবেষক ও ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্ব নিতে হবে এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার—“নিষিদ্ধ রাসায়নিক মানেই জাতির ক্ষতি।”
বাংলাদেশের চিংড়ি একসময় ইউরোপের সুপারমার্কেটে “গোল্ডেন প্রডাক্ট” হিসেবে পরিচিত ছিল। আবারও সেই অবস্থানে ফিরতে হলে আমাদের সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি ও সততার বিকল্প নেই। নিরাপদ চিংড়ি উৎপাদনই হতে পারে বাংলাদেশের টেকসই রপ্তানি অর্থনীতির নতুন দিগন্ত।