
একটা সময় ছিল—দূর থেকে কোনো শিক্ষককে দেখা মাত্রই সাইকেল থামিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে যেতাম। শুধু আমি নই, আমরা অনেকেই। শ্রদ্ধার জায়গাটা ছিল এতটাই গভীরে, যে তা কোনো নিয়ম বা বাধ্যবাধকতা দিয়ে নয়—চর্চা, মন, মগজ ও আত্মায় লালিত হতো। আমরা সেই প্রজন্ম, যাদের রক্তে বইতো শিক্ষক-ভক্তির এক অবিনাশী ধারা।
শিক্ষকের মুখে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ ছিল আমাদের জন্য ধ্রুবতারা। তাঁরা শুধু পাঠ্যবইয়ের পাঠদান করতেন না, শেখাতেন কীভাবে মানুষ হতে হয়। শিখাতেন মঞ্চে কথা বলতে, কোনো আয়োজনে দায়িত্ব নিতে, কিংবা জীবনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তগুলোর ভেতরেও বড় শিক্ষা খুঁজে নিতে। খালি হাতে তাঁরা জাতি গড়েছেন—জ্ঞান আর আদর্শ দিয়ে।
আজকের প্রজন্ম সেই জায়গা থেকে অনেক দূরে সরে এসেছে। এখন শিক্ষকের ক্লাসেও অনেকে মোবাইল স্ক্রলে ব্যস্ত থাকে, শ্রদ্ধাভরে সালাম দেয়ার সংস্কৃতি দিনকে দিন হারিয়ে যাচ্ছে। এমনকি অনেক সময় শিক্ষকের সঙ্গে বেয়াদবি, বেপরোয়া আচরণ বা সামাজিক মাধ্যমে অপমানের ঘটনাও সামনে আসে। কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকরা নিজেরাও হয়তো দায় এড়াতে পারেন না। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, দায়িত্বহীনতা কিংবা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ক দুর্বল হয়েছে অনেক জায়গায়।
তবে এখনও অনেক ছাত্র-ছাত্রী আছে, যারা আজও শিক্ষকের পা ছুঁয়ে সালাম করে, দোয়া চায়, আদর্শ খোঁজে। এখনও অনেক শিক্ষক আছেন, যারা দিনরাত এক করে চেষ্টা করছেন ভবিষ্যৎ গড়তে। এই দুই পক্ষই আমাদের শেষ আশার বাতিঘর।
আজকের এই সময়ে ফিরে তাকালে মনে পড়ে—একসময় শিক্ষকরা ছিলেন অভিভাবকের মতো। আমরা তাঁদের চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝে নিতাম ঠিক-ভুল। এখন সেই জায়গাটা প্রযুক্তি, নম্বর আর ভোগবাদী দৌড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে।
আমাদের দরকার ফের সেই আত্মিক সংস্কৃতির—যেখানে শিক্ষক শুধু একজন চাকরিজীবী নন, বরং একজন ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ হিসেবে শ্রদ্ধার আসনে থাকবেন। আর শিক্ষার্থী কেবল পাসের যন্ত্র নয়, বরং আদর্শবান নাগরিক হয়ে গড়ে উঠবে।
আসুন, আমরা আবার সেই প্রজন্ম হই—যারা শিক্ষক দেখলে উঠে দাঁড়াই, সালাম দিই, শ্রদ্ধা করি এবং তাঁদের কাছ থেকে শুধু শিক্ষা নয়, মানুষ হবার প্রেরণাও নিই।
মামুন হাচান
কো-অর্ডিনেটর
সাউথ এশিয়ান ক্রাইম ওয়াচ সোসাইটি (পর্যবেক্ষণ ও মানবাধিকার সংস্থা)