
ঢাকা, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ — বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় তিনি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
বিগত ২৩ নভেম্বর থেকে খালেদা জিয়া হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এবং আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার অবস্থা অত্যন্ত জটিল এবং সংকটময় মুহূর্ত পার করছিলেন বলে জানিয়েছিলেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন।
জীবনপথ ও রাজনৈতিক যাত্রা
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা মজুমদার। শৈশবে তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও পরবর্তীতে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ফার্স্ট লেডি হিসেবে তিনি বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পর দলের সংকটময় মুহূর্তে রাজনীতিতে পদার্পণ করেন। ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮৩ সালে ভাইস-চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
১৯৮০-এর দশকে তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন। আপসহীন সংগ্রামের কারণে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। দীর্ঘ আন্দোলনে তিনি সাতদলীয় জোট গঠন করেন এবং স্বৈরাচারের পতন না হওয়া পর্যন্ত কোনো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার দৃঢ় ঘোষণা দেন। এ সময় তাকে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সাতবার আটক ও গৃহবন্দী করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কার্যকাল
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে জয়লাভ করে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। তার নেতৃত্বে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শিক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন; বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা এবং উপবৃত্তি কর্মসূচি চালু করেন। এছাড়া সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ থেকে ৩০ বছরে উন্নীত করেন।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি পরাজিত হলেও তিনি ১১৬টি আসন নিয়ে সংসদে বৃহত্তম বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯ সালে চারদলীয় জোট গঠন করেন এবং ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় নিয়ে আবারও প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৫ সালে ফোর্বস ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় ২৯ নম্বরে স্থান দেয়।
খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে কোনো আসনেই পরাজিত না হওয়ার অপ্রতিদ্বন্দ্বী রেকর্ডের অধিকারী। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেট সিনেট তাঁকে ‘গণতন্ত্রের যোদ্ধা’ উপাধিতে ভূষিত করে।
সাম্প্রতিক কালে
২০১৮ সালে বিতর্কিত একটি মামলার রায়ে তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইন বিশেষজ্ঞরা এই বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পরে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে সব মামলায় খালেদা জিয়াকে খালাস দেওয়া হয়।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিএনপি, সহযোগী সংগঠন, এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন শোক প্রকাশ করেছে। জানাজা ও দাফন সংক্রান্ত কার্যক্রম পরবর্তীতে জানানো হবে।
NGS/MMH