
অথই নূরুল আমিন
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলাম লেখক ও রাষ্ট্রচিন্তক
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের জাপান সফরকে কেন্দ্র করে সফরসঙ্গীদের তালিকায় আমজনতার দলের মো. তারেক রহমানের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। আমার দৃষ্টিতে, এমন উদ্যোগ রাজনৈতিক সহনশীলতা, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা এবং উদার মানসিকতার পরিচায়ক। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রশংসা করতেই হয়।
আমজনতার দলের মো. তারেক রহমান প্রচলিত অর্থে সমাজের উচ্চবিত্ত বা প্রভাবশালী শ্রেণির প্রতিনিধি নন। তবে তাঁর কিছু বক্তব্য এবং অতীতের কয়েকটি আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তিনি একটি শ্রেণির মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে আমি সহজ-সরল এবং দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে দেখি। তাঁর বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যেও একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়।
অবশ্য তাঁর কিছু বক্তব্যের কারণে ভিন্নমতের মানুষের মধ্যে অসন্তোষও রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তাঁর বক্তব্য ও ভিডিওতে উঠে আসা কয়েকটি অবস্থান বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। যেমন—জুলাইয়ের আন্দোলনকে বড় করে দেখাতে গিয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করা যাবে না; মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়, এমন কাজ করা উচিত নয়; আওয়ামী লীগের মধ্যে যারা অপরাধী নন, তাঁদের অহেতুক হয়রানি করা উচিত নয়; আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া উচিত এবং মিথ্যা মামলায় কোনো মুক্তিযোদ্ধা কারাগারে থাকুন, তা কাম্য নয়।
এসব বক্তব্যের সঙ্গে কেউ একমত হতে পারেন, কেউ দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। গণতান্ত্রিক সমাজে মতপার্থক্য থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভিন্নমতের কারণে কাউকে ব্যক্তিগতভাবে হেয় করা কিংবা উপহাসের লক্ষ্যবস্তু বানানো কোনোভাবেই সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় হতে পারে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের কর্মকাণ্ড নিয়ে মো. তারেক রহমানকে প্রায়ই বক্তব্য দিতে দেখা যায়। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে কারও দ্বিমত থাকলে যুক্তি দিয়ে সমালোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটূক্তি কিংবা বিদ্রূপের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্যের জবাব দেওয়া সমীচীন নয়।
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের সফরসঙ্গীদের তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের মন্তব্য ও বিদ্রূপের কথা সামনে এসেছে। কেউ তাঁকে ‘আম তারেক’ বলে কটাক্ষ করেছেন, আবার কেউ ব্যঙ্গ করে বলেছেন, এবার আম জাপানে রপ্তানি হবে। আমার বিবেচনায়, এ ধরনের মন্তব্য রাজনৈতিক আলোচনা ও মতপ্রকাশের সুস্থ পরিবেশ তৈরিতে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখে না।
একজন মানুষকে তাঁর আর্থিক অবস্থান, সামাজিক পরিচিতি কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে মূল্যায়ন না করে তাঁর বক্তব্য, কাজ ও ভূমিকার ভিত্তিতে বিচার করাই অধিক যুক্তিসংগত।
নিবন্ধনের দাবিতে অনশন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
আমজনতার দলের নিবন্ধন পাওয়ার দাবিতে নির্বাচন কমিশন ভবনের সামনে মো. তারেক রহমানের অনশনের ঘটনাটিও আলোচনার দাবি রাখে। বিভিন্ন সময়ে নির্বাচন কমিশনে যোগাযোগ করেও সমাধান না পাওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি অনশনে বসেছিলেন বলে জানা যায়। দীর্ঘ সময় ধরে অনশন চালিয়ে যাওয়ার সময় তিনি অসুস্থও হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে তৎকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁকে অনশন ভাঙানোর উদ্যোগ নেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আমার প্রশ্ন হলো, একটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন পাওয়ার দাবি নিয়ে একজন ব্যক্তিকে কেন এত দীর্ঘ সময় অনশন করতে হবে? নির্বাচন কমিশনের কাছে বারবার যাওয়ার পরও যদি কোনো সমাধান না পাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি যথাযথভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে আইন ও বিধিবিধানই চূড়ান্ত মানদণ্ড হওয়া উচিত। কোনো দলকে তার আর্থিক সামর্থ্য, নেতার সামাজিক অবস্থান কিংবা প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে নয়, বরং নির্ধারিত আইনগত শর্ত পূরণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
দেশে রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে যদি কোনো বৈষম্য বা অসংগতি থেকে থাকে, তাহলে তা দূর করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। নিয়ম মেনে আবেদন করার পরও কোনো দল বা আবেদনকারী যদি দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন, তবে সেই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেওয়াও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের অংশ।
আমাদের রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের হয়রানি, দুর্নীতি এবং অনিয়ম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে। সরকারি দপ্তরে কাজ করাতে গিয়ে মানুষকে ভোগান্তির শিকার হতে হয়—এমন অভিযোগও প্রায়ই শোনা যায়। নিয়োগ, পদোন্নতি কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রমে ঘুষের অভিযোগ উঠলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সবার জন্য সমানভাবে কাজ করে, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা বাড়বে। আর সেই আস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হলে ক্ষমতা, অর্থ কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে।
ভিন্নমত থাকুক, অসম্মান নয়
আমজনতার দলের মো. তারেক রহমান অতীতে বিভিন্ন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের কিছু অংশ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। এমনকি নির্বাচন কমিশনের সামনে অনশন চলাকালে তৎকালীন সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে উদ্দেশ করে তাঁর কঠোর ও অশালীন ভাষা ব্যবহারের ঘটনাও আলোচনায় এসেছিল।
আমি মনে করি, অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ক্ষোভ, হতাশা কিংবা অভিমান প্রকাশ পেতে পারে। তবে রাজনৈতিক বক্তব্যে শালীনতা বজায় রাখা সব পক্ষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, কারও বক্তব্যের কারণে তাঁর অধিকারকে উপেক্ষা করা কিংবা তাঁকে অপমান করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন—বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশা ভিন্ন হতে পারে। তাঁদের প্রত্যেকের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং আইনসম্মতভাবে মূল্যায়ন করা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
রাজনৈতিক সহনশীলতার চর্চা অব্যাহত থাকুক
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের সফরসঙ্গীদের তালিকায় আমজনতার দলের মো. তারেক রহমানের নাম অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগকে আমি ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে চাই। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ভিন্ন রাজনৈতিক ধারার একজন ব্যক্তিকে এমন সফরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়ে থাকলে তা পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার একটি বার্তা দিতে পারে।
আমি দীর্ঘ তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে লেখালেখি করছি। আমার লেখার উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা অর্জন কিংবা বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা নয়। আমি বিশ্বাস করি, সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের পক্ষে কথা বলা এবং অন্যায়-অনিয়মের সমালোচনা করা একজন লেখকের দায়িত্ব।
দেশের রাজনীতিতে এমন পরিবেশ গড়ে উঠুক, যেখানে ভিন্নমতের মানুষও সম্মান নিয়ে কথা বলতে পারবেন; যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ অবহেলিত হবেন না; যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আইন অনুযায়ী সবার প্রতি সমান আচরণ করবে।
প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের উদ্যোগ যদি রাজনৈতিক সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার চর্চাকে এগিয়ে নেয়, তবে তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক হবে। ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও কটূক্তির রাজনীতি পরিহার করে যুক্তি, দায়িত্বশীলতা ও দেশপ্রেমের ভিত্তিতে রাজনীতিকে এগিয়ে নেওয়া এখন সময়ের দাবি।
আমি প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের সফলতা কামনা করছি। একই সঙ্গে প্রত্যাশা করছি, দেশের সাধারণ মানুষ, অধিকারবঞ্চিত নাগরিক এবং রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা ব্যক্তিদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকার আন্তরিক ভূমিকা রাখবে।
দেশ এগিয়ে যাক, মানুষের স্বপ্ন পূরণ হোক। রাজনৈতিক সহনশীলতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে গড়ে উঠুক একটি সুন্দর বাংলাদেশ।
সবাই ভালো থাকুন। আল্লাহ হাফেজ।
অথই নূরুল আমিন
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলাম লেখক ও রাষ্ট্রচিন্তক
প্রধান মুখপাত্র, জাতীয় মানবসম্পদ উইং
গ্রন্থলেখক
২৮ অক্টোবর ২০২৬